অর্থনীতি পুনর্গঠনে বিনিয়োগবান্ধব নীতি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিচ্ছে সরকার
বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা জটিল ও দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
একটি কোম্পানি চালু করতে বর্তমানে ২৫-২৬ ধরনের লাইসেন্স ও অনুমতির প্রয়োজন হয়। কর ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে নীতিগত বেড়াজালে আটকে পড়ছে শিল্পোদ্যোগ ও বিনিয়োগ, যা দেশের অর্থনীতিকে ব্যাহত করছে। তবে নতুন সরকার নানামুখী ব্যবসাবান্ধব উদ্যোগ নিচ্ছে। নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়েছে। এতে উদ্যোক্তারা নিয়মের বেড়াজালে আটকে না থেকে অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটাতে পারবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘১৫তম আন্তর্জাতিক বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনোভেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইআইডি) এক্সপো ও ডায়ালগ ২০২৬’ এবং ‘ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্যাকেজিং এক্সপো ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
‘১৫তম আন্তর্জাতিক বাংলাদেশ অবকাঠামো উদ্ভাবন ও উন্নয়ন প্রদর্শনী এবং সংলাপ ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। দেশে সৌরবিদ্যুৎ বা সোলার খাতের প্রসারে উদ্যোক্তাদের কর ও বিশেষ নীতিগত সুবিধা দেয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার সোলার খাতের উদ্যোক্তাদের কর সুবিধা দেয়ার বিষয়ে কাজ করছে। চলতি মাসেই পূর্ণাঙ্গ নীতি চূড়ান্ত করা হবে। জুনের মধ্যে তা মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সরকারি আদেশ হিসেবে জারি করা সম্ভব হবে।’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে একটি কমিটি গঠন করেছেন। কমিটির প্রথম বৈঠকও হয়েছে। বাংলাদেশ সোলার খাতে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। উদ্যোক্তাদের সে সক্ষমতাও আছে। নিয়মকানুন আরো সহজ করা গেলে উদ্যোক্তারা ইনভার্টার, ফ্রেম, সৌর প্যানেলসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সহজে দেশে এনে স্থাপন করতে পারবেন।’ মন্ত্রী আরো বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। তবে সরকারের নতুন নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।’
‘১ম আন্তর্জাতিক ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্যাকেজিং এক্সপো ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করতে উদ্যোক্তাদের জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিডায় গিয়ে একটি কোম্পানি নিবন্ধন করতে দেশী-বিদেশী কোম্পানির জন্য ২৫-২৬টি ভিন্ন লাইসেন্স ও পারমিট লাগে।’ পরিস্থিতি বদলাতে সরকার নতুন ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যে কোম্পানি বিডায় গিয়ে রেজিস্ট্রি করবে, তাকে আমরা সবকিছুর জন্য প্রভিশনাল লাইসেন্স বা ক্লিয়ারেন্স দেব। এরপর কোম্পানি এক থেকে দুই বছরের মধ্যে স্থায়ী লাইসেন্সগুলো সম্পন্ন করবে।’
বাংলাদেশে ব্যবসার আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে উচ্চ লজিস্টিক ব্যয়ের কথা উল্লেখ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বিশ্বে গড় লজিস্টিক কস্ট জিডিপির ১০ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা প্রায় ১৬ শতাংশ। আমাদের বন্দর আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম দক্ষ। যে কারণে ইউনিটপ্রতি খরচ বেড়ে যায়। এ সমস্যা সমাধানে সরকার আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে বন্দর পরিচালনায় যুক্ত করছে।’
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের কাজ হলো নীতিগত সহায়তা দেয়া। সরকার চায় উদ্যোক্তারা বড় হোক, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করুক এবং বাংলাদেশের পণ্য বিদেশে রফতানি হোক। যাতে আরো বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা যায়।’
‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা ও সবুজ প্রযুক্তি’ শীর্ষক সেমিনারের প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্যে দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাসযোগ্য দেশ গড়তে বর্জ্য থেকে জ্বালানি, সোলার ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশ বছরে প্রায় নয় মাস তীব্র সূর্যালোক পায়, যা দেশের জন্য বড় সুযোগ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন আয়োজক প্রতিষ্ঠান এক্সপোনেন্ট এক্সিবিশন প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল হক। এতে আরো উপস্থিত ছিলেন টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মুজাফফর আহমেদ, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও সিইও মোহাম্মদ হাসান আরিফ, বাংলাদেশ ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাফিউস সামি আলমগীর, বাংলাদেশ এলিভেটর, এস্কেলেটর অ্যান্ড লিফট আমদানিকারক সমিতির সভাপতি মো. শফিউল আলম উজ্জ্বলসহ আরো অনেকে।
আয়োজকেরা জানান, তিনদিনের প্রদর্শনী আগামীকাল পর্যন্ত চলবে। এতে ১২টি দেশের প্রায় ১৪০টি কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। প্রদর্শনীতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতের বিভিন্ন পণ্য, প্রযুক্তি ও সেবা তুলে ধরা হচ্ছে। প্রদর্শনীর মিডিয়া পার্টনার হিসেবে রয়েছে বণিক বার্তা।


