চীনের বাণিজ্যিক জোটে যেতে প্রস্তুত বাংলাদেশ
চীনের নেতৃত্বাধীন বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক জোট রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসেপ) যোগ দেওয়ার আগে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সুশাসন বিষয়ে নানান প্রশ্নের জবাব চাওয়া হয়েছে বাংলাদেশের কাছে। আরসেপ সচিবালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো দ্বিতীয় দফার প্রশ্নে বৈদেশিক বিনিয়োগ, সেবাবাণিজ্য উদারীকরণ, মেধাস্বত্ব, ই-কমার্স এবং সুশাসন তথা বিভিন্ন খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের প্রক্রিয়া ও পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে। ৮ মে এসব প্রশ্নের জবাব দেবে বাংলাদেশ। আরসিইপিতে (আরসেপ) যোগদানের জন্য প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন ও প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র এ তথ্য জানিয়েছেন।
সূত্র জানান, আরসেপ থেকে পাঠানো প্রশ্নগুলোর বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মতামত নেওয়া হয়েছে। মেধাস্বত্ব ইস্যুতে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে (১০ থেকে ১৫ বছর) অব্যাহতি চাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেবা খাতে বিনিয়োগ উন্মুক্তকরণের সীমা নির্ধারণ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা বিডাকে। এ ছাড়া ই-কমার্স বাণিজ্যে ডিজিটাল পণ্য আমদানিতে শুল্কছাড়ের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সূত্র বলছেন, আরসিইপিতে যোগ দিলে দেশের জিডিপি সামগ্রিকভাবে ০.২৬ শতাংশ বাড়বে। তবে প্রতিযোগিতাসক্ষমতা না বাড়লে সেবা, বিনিয়োগ এবং ই-কমার্স খাত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
আরসেপ সচিবালয়ের প্রশ্নের জবাব তৈরি করতে গতকাল বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে একটি আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে প্রশ্নগুলোর জবাব তৈরি করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মতামত চাওয়া হয় বলে জানা গেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে শুল্কসুবিধা নিশ্চিত করার জন্য দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তিতে যেতে হচ্ছে; যা জটিল ও সময়সাপেক্ষ। উপরন্তু চীনের নেতৃত্বাধীন ১৫ সদস্যের এই বাণিজ্যিক জোটে যোগ দিলে অনেক দেশে বাণিজ্যসুবিধা নিশ্চিত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। সে কারণে নির্বাচিত সরকার এ জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আরসেপ থেকে দ্বিতীয় দফার প্রশ্ন পাঠানো হয় সরকারের কাছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, আসিয়ানভুক্ত ১০টি দেশ এবং জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে নিয়ে চীনের নেতৃত্বে ২০২০ সালের নভেম্বরে চালু হয় বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক জোট আরসেপ। ২০২৪ সালে এ জোটে যোগদানের বিষয়ে প্রস্তাব পাঠায় বাংলাদেশ। তবে পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তন এবং নির্বাচন-বিভিন্ন কারণে প্রক্রিয়াটি থেমে যায়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানান, আরসেপ চুক্তির লক্ষ্য হলো পণ্য, পরিষেবা এবং বিনিয়োগের ওপর শুল্ক ও অশুল্ক বাধা পর্যায়ক্রমে দূর করার মাধ্যমে একটি আধুনিক ও ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারি তৈরি করা। সে কারণে বাণিজ্য, বিনিয়োগের পাশাপাশি মেধাস্বত্ব, ই-কমার্স এবং এসএমই ও কারিগরি সহযোগিতার মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশ কতটা সক্ষম তা যাচাই করে দেখতে চায় আরসেপ। আরসিইপির প্রতিশ্রুতিগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ও ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে মেধাস্বত্ব বা আইপিআর পরিপালনে বাংলাদেশ এখনো প্রস্তুত নয়। তাই এ বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অব্যাহতি বা ছাড় চাওয়া হবে আরসেপের কাছে। এ ছাড়া বৈদেশিক বিনিয়োগ অনুমোদন প্রক্রিয়া, মূলধনসীমা এবং সেবা বাণিজ্যে তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবহন ও পর্যটন অবকাঠামো খাতেও সক্ষমতার অভাব রয়েছে। বাণিজ্য জোটে যুক্ত হলে পর্যায়ক্রমে এসব ঘাটতি পূরণে প্রয়োজনীয় সংস্কার করার প্রতিশ্রুতি দেবে বাংলাদেশ।
জানা গেছে, ২০২৪ সালে করা একটি মূল্যায়নে দেখা গেছে, এ জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের রপ্তানি ৩.২৬ বিলিয়ন ডলার এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) ৩.৩৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। রপ্তানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসবে পোশাকশিল্প থেকে এবং এ খাতে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা ১৮ শতাংশ বাড়বে।


