বৈশ্বিক ট্রেডিং গ্রুপগুলোর বিলিয়ন ডলারের লোকসান
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে পণ্য কেনাবেচাকারী বা কমোডিটি ট্রেডিং গ্রুপগুলো বড় ধরনের আর্থিক ধাক্কার সম্মুখীন হয়েছে।
ছয় সপ্তাহ আগে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এসব প্রতিষ্ঠানকে শতকোটি বা বিলিয়ন ডলার লোকসান গুনতে হয়েছে বলে জানিয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অলিভার ওয়াইম্যান। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
সাধারণত দেখা যায়, বিশ্বে কোনো বিশৃঙ্খলা বা অস্থিরতা তৈরি হলে অস্থিতিশীল বাজার থেকে এসব ট্রেডিং হাউজ বড় অংকের মুনাফা তুলে নেয়। কিন্তু এবারের চিত্রটি ছিল ভিন্ন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পারস্য উপসাগরে শতাধিক জ্বালানি তেলের ট্যাংকার আটকা পড়ে যায়। তেল সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ লাফিয়ে বাড়ে, যা অনেক ব্যবসায়ীর প্রত্যাশার বাইরে ছিল।
অলিভার ওয়াইম্যানের রিস্ক অ্যান্ড ট্রেডিং বিভাগের প্রধান আলেকজান্ডার ফ্রাঙ্ক জানান, মার্চের শুরুর দিকে লোকসানের পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। সংঘাত শুরুর আগ পর্যন্ত বাজারে তেলের দাম কমবে বলেই ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরু থেকেই দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভিটল, ট্রাফিগুরা ও মারকিউরিয়ার মতো বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ট্রেডিং হাউজগুলো যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোয় লোকসানের কবলে পড়ে। অবশ্য পরবর্তী সময়ে এগুলোর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান লোকসান কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে বলে জানা গেছে।
জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীদের জন্য আরেকটি বড় আপদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘মার্জিন কল’। যেসব ব্যবসায়ীর পণ্যবাহী জাহাজ সাগরে ভাসমান ছিল তারা মূলত ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার মার্কেটে দাম কমার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। সাধারণত নিজেদের ভৌত পণ্য বা ফিজিক্যাল কার্গোর মূল্যহ্রাসের ঝুঁকি এড়াতে (হেজিং) এ কৌশল নেয়া হয়। কিন্তু তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় এসব আগাম চুক্তির বিপরীতে তাদের বিশাল অংকের নগদ অর্থ জমা দিতে হয়েছে, যাকে কারিগরি ভাষায় মার্জিন কল বলা হয়। যদিও মার্জিন কল সরাসরি কোনো চূড়ান্ত লোকসান নয়, তবে এটি একটি বিশাল নগদ অর্থ ব্যয়ের বিষয়, যা অনেক সময় কোম্পানির তারল্য সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবসায়ীরা শুধু তেলের দামের ভুল অনুমানের কারণেই লোকসানে পড়েননি; পারস্য উপসাগরে আটকা পড়া তেলের চালানগুলোর বদলে চড়া দামে বিকল্প ব্যবস্থা করতে গিয়েও বড় অংকের ক্ষতি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট খাতের নির্বাহীরা জানান, কোম্পানিগুলো আগে থেকেই নির্ধারিত দামে ভবিষ্যৎ তারিখে তেল বিক্রির চুক্তি করে রেখেছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় বন্দরে জাহাজ আটকা পড়ায় সময়মতো ক্রেতাকে পণ্য দেয়া যায়নি। ফলে চুক্তি রক্ষা করতে বাজার থেকে অনেক বেশি দামে বিকল্প তেল কিনতে হয়েছে, যা ট্রেডিং কোম্পানির খরচের বোঝা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমোডিটি ট্রেডিং হাউজগুলোই অতীতে যুদ্ধের সময় রেকর্ড মুনাফা করেছিল। বিশেষ করে ২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটের সময় এসব প্রতিষ্ঠান ইতিহাসের সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করেছিল।
অলিভার ওয়াইম্যানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে এ খাতের মোট আয় ছিল রেকর্ড ১১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। তবে ২০২৩ সালে তা কিছুটা কমে ৯ হাজার ২০০ কোটি ডলারে নেমে আসে, যা ২০২১ সালের পর সর্বনিম্ন। গত বছর তেলের বাজারের অস্থিরতা অস্বাভাবিক কম থাকায় তেল কেনাবেচায় মুনাফা কমেছিল ১৫ শতাংশ । তবে এর বিপরীতে ধাতু বা মেটাল ট্রেডিং ছিল ইতিবাচক, যেখানে মুনাফা বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ।
অস্থিতিশীল বাজার মোকাবেলা করতে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সামলাতে বড় ট্রেডিং হাউজগুলো কার্যকরী মূলধনের (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) পরিমাণ বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। তথ্যানুযায়ী, ভিটল ও ট্রাফিগুরা প্রত্যেকে ৩০০ কোটি ডলার করে অতিরিক্ত ক্রেডিট সুবিধা বা ঋণ গ্রহণ করেছে।
অন্যদিকে গানভোর নিশ্চিত করেছে ১৫০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত ঋণ সুবিধা। মুনাফার টানাপড়েনের মধ্যেও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার খরচ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। একজন ট্রেডারের জন্য প্রয়োজনীয় টার্মিনাল, তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তার খরচ ২০২১ সালের তুলনায় ৩০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
অলিভার ওয়াইম্যানের অংশীদার ও প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক মার্ক জিমারলিন বলেন, ‘গত কয়েক বছরের দিকে তাকালে মনে হয় আমরা একের পর এক বিরল বা “জীবনকালে একবার দেখা যায়’’ এমনসব ঘটনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এ ধরনের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা কোনো কোম্পানির ব্যবসায়িক পরিকল্পনার স্বাভাবিক অংশ থাকে না।’


