শিরোনাম

South east bank ad

ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ

 প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ন   |   কনজুমার প্রোডাক্টস

ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ

কিছুদিন আগে এক ব্যবসায়ী আমাকে ব্যাংকঋণ নিয়ে তার দুঃখের কথা জানালেন। সেই ব্যবসায়ী একটি ব্যাংক থেকে তাঁর ব্যবসার প্রয়োজনে কিছু ঋণ গ্রহণ করেছেন, যার মধ্যে আছে কয়েক ধরনের ঋণ, যেমন-ওভারড্রাফট, মেয়াদি ঋণ বা টাইম লোন এবং এলসি (লেটার অব ক্রেডিট)।

এই ঋণ সুবিধা নিয়ে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছিলেন না। বিশেষ করে টাইম লোন নিয়ে তাঁর বেশ সমস্যা হচ্ছিল।
তাই তিনি ব্যাংকের শাখায় আবেদন করেছিলেন, টাইম লোন বাতিল করে ওভারড্রাফটের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিত সেই ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখার ব্যবস্থাপক তাঁকে জানান, প্রথমে নির্ধারিত হারে ডাউন পেমেন্টের অর্থ জমা দিতে হবে, তাহলে তাঁর এই প্রস্তাবটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠাবে অনুমোদনের জন্য।

সেই ব্যবসায়ীর ঋণ খেলাপি হয়নি, তাহলে তাঁকে কেন শুধু ঋণের ধরন পরিবর্তনের জন্য ডাউন পেমেন্টের অর্থ জমা দিতে হবে, তা সেই ব্যবসায়ী কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না। আর এ কারণেই তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন ভালোভাবে বোঝার জন্য।
সেই ব্যবসায়ীর কথা শুনে আমি বললাম, ‘আমি নিজেই তো আপনার মতো কিছু বুঝতে পারছি না, তাহলে আপনাকে বোঝাব কিভাবে।’

বিষয়টি ভালো করে জানার জন্য আমি পরিচিত কয়েকজন শাখা ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলেছি।

কিন্তু তাঁরাও আমাকে বিষয়টি সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি। তবে সবাই একটি কথা পরিষ্কার করে বলেছেন, তাঁদের প্রধান কার্যালয় থেকে যেভাবে বলবে সেভাবেই ঋণ প্রস্তাব পাঠাতে হবে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমি যখন তাঁদের পাল্টা প্রশ্ন করলাম, আপনারা তো এ ব্যাপারে ইস্যুকৃত সার্কুলার মেনে কাজ করবেন। প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকেন কেন? আমার এমন কথা শুনে অধিকাংশই চুপ করে ছিলেন।

তবে দু-একজন সাহস করে একটি অপ্রিয় সত্য কথা বলে ফেলেছেন। তাঁরা আমাকে স্পষ্ট বলে দিলেন, ‘স্যার, আপনি উন্নত দেশের ব্যাংকে চাকরি করেন, তাই আমাদের অবস্থা বুঝবেন না। এখানে সার্কুলার অনেক পরে। আগে হেড অফিসের কথামতো কাজ করতে হবে। না হলে আপনি এখানকার ব্যাংকে চাকরিই করতে পারবেন না।’ কথাগুলো শুনে ভাবলাম। আসলেই তো তাই। বাংলাদেশে ব্যাংকে সার্কুলারের গুরুত্ব অনেক পরে। সেখানে চেয়ারম্যান যেভাবে বলবেন, এমডি (ম্যানেজিং ডিরেক্টর) সেভাবেই ব্যাংক চালাবেন। আবার এমডি যেভাবে বলবেন, অন্য ব্যাংকাররা সেভাবেই কাজ করবেন।

এই বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন ব্যাংকারের সঙ্গে আলোচনা করে আরো একটি বিষয় বুঝতে পেরেছি, তা হচ্ছে-অধিকাংশ ব্যাংকার ভালোভাবে জানেনই না যে ঋণ পুনঃতফসিল (রিস্ক্যাজুয়াল) এবং ঋণ পুনর্গঠনের (রিস্ট্রাকচার) মধ্যে পার্থক্য আছে। আমার লেখার শুরুতে যে ব্যবসায়ীর কথা উল্লেখ করেছি, তাঁর আবেদনটি ছিল মূলত ঋণ পুনর্গঠনের, ঋণ পুনঃতফসিলের নয়। যা হোক সেই ব্যাংকারদের সঙ্গে কথা বলে যা বুঝলাম তাতে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ পুনর্গঠনের ধারণাটাই সেভাবে প্রচলিত নয়।

আমরা যখন দেশে ব্যাংকে কাজ করেছি তখনও এই ঋণ পুনর্গঠনের প্রচলন ছিল না এবং এত বছর পরে এসে এখনো এর প্রচলন নেই। কার্যকর ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ঋণ পুনর্গঠন এবং ঋণ পুনঃতফসিল দুটি পৃথক এবং স্বতন্ত্র ব্যবস্থা। এই দুই পদ্ধতি একদিকে যেমন বহুল ব্যবহৃত, অন্যদিকে তেমনি এই দুইয়ের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান।
ঋণ পুনর্গঠন মূলত নিয়মিত ভালো ঋণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

পক্ষান্তরে ঋণ পুনঃতফসিল খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। প্রথমোক্তটি একটি ঋণকে ভালো রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়। আর শেষোক্তটি খেলাপি ঋণকে ভালো করার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ঋণ পুনর্গঠন একটি ব্যাংকের ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগের নিয়মিত কার্যক্রম। এ জন্য বিশেষ কোনো নিয়ম বা শর্ত মেনে চলার বাধ্যবাধকতা নেই, যেমন-ডাউন পেমেন্ট প্রদানের বাধ্যবাধকতা না থাকা। শুধু ব্যাংকের ক্রেডিট পলিসির মধ্যে থাকলেই এই সুবিধা ঋণগ্রহীতাদের দেওয়া যেতে পারে। পক্ষান্তরে ঋণ পুনঃতফসিল ব্যাংকের একটি বিশেষ ব্যবস্থা, যা বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ঋণদাতা ব্যাংকের বিশেষ নিয়ম ও শর্ত মেনে প্রদান করতে হয়। ঋণ পুনর্গঠন ব্যাংকের সাধারণ সেবা এবং ঋণ চুক্তির অংশ, তাই গ্রাহকের এই সুবিধা পাওয়ার অধিকার আছে। গ্রাহক চাইলে ব্যাংক এই সুযোগ গ্রাহককে দিতে বাধ্য। অবশ্যই গ্রাহকের সেই চাওয়া ব্যাংকের ক্রেডিট পলিসির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। কিন্তু ঋণ পুনঃতফসিল ব্যাংকের একটি ঐচ্ছিক সুবিধা, যা কোনো ঋণখেলাপিকে দেওয়া হবে কি না, তা ব্যাংকের একান্তই নিজস্ব ব্যাপার। এই সুবিধা নেওয়ার জন্য গ্রাহক তাঁর অধিকার হিসেবে দাবি করতে পারেন না।

গ্রাহক অনুরোধ করতে পারেন, কিন্তু ব্যাংক সেটা মানবে কি না, তা ব্যাংকের একান্তই নিজস্ব ব্যাপার। যেমন-ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে কৌশল হিসেবে চাইলে খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে সম্পূর্ণ ঋণের টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলতে পারে, আবার ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা দিয়েও ঋণ আদায়ের চেষ্টা চালাতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক মাঝে মধ্যে খেলাপি ঋণ আদায়ের উদ্দেশ্যে ঋণ পুনঃতফসিল সংক্রান্ত বিভিন্ন সার্কুলার ইস্যু করে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ঋণদানকারী ব্যাংক খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করতে বাধ্য। ব্যাংক চাইলে করবে, না চাইলে করবে না। তবে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ইস্যুকৃত সার্কুলার মেনে করতে হবে।

ব্যবসায়ীদের ব্যাংকঋণের টাকা সুবিধাজনকভাবে ব্যবহার করার সুবিধার্থে ঋণ পুনর্গঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেননা, যে ব্যবসার প্রয়োজনে ঋণ গ্রহণ করা হয়, সেই ব্যাবসায়িক কার্যক্রম প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলে। আর ব্যবসার পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হয়। পক্ষান্তরে ঋণ গ্রহণ বা ঋণচুক্তি সম্পাদন করা হয় একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, যেমন-তিন বা পাঁচ বছরের জন্য। এই সময়ের মধ্যে ঋণের অর্থের সফল ব্যবহার নিশ্চিত করার স্বার্থে গৃহীত মোট ঋণের পরিমাণ ঠিক রেখে ঋণের ধরন পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয়। যেমন-একজন ঋণগ্রহীতার ওভারড্রাফট সুবিধা কমিয়ে টাইম লোনের পরিমাণ বাড়িয়ে নেওয়া বা এর বিপরীত অবস্থার প্রয়োজন হতে পারে। আবার টার্ম লোনের মাসিক কিস্তির পরিমাণ ব্যবসার নগদ প্রবাহ বা ক্যাশ-ফ্লোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিশোধ করার স্বার্থে ঋণের মেয়াদ ১০ বছর থেকে বাড়িয়ে ১৫ বছর করার প্রয়োজন হতে পারে। এমনকি বেশি সুদের হারের ঋণ থেকে কম সুদের হারের ঋণে পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। ঋণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঋণের মেয়াদকালে এ রকম অনেক পরিবর্তনের আবশ্যিকতা দেখা দেয়, যা পরিবর্তনের জন্য ঋণ পুনর্গঠন সুবিধার বিশেষ প্রয়োজন।

ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা থাকলে একদিকে যেমন ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণের টাকা খুবই কার্যকরভাবে ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করতে পারেন, অন্যদিকে ঋণখেলাপি হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা যায়। আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতে যে বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ, তার অনেক কারণের মধ্যে একটি কারণ হচ্ছে-ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা না থাকা এবং সেই সুবিধা ঋণ পরিচালনা কার্যক্রমে ব্যবহার না করা। অথচ ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর এই ব্যবস্থার ব্যবহার আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতে সেভাবে নেই বললেই চলে। দু-একটি ব্যাংক হয়তো বিচ্ছিন্নভাবে এই ব্যবস্থা অনুসরণ করে থাকতে পারে। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিভিত্তিক এই ব্যবস্থার প্রচলন নেই বললেই চলে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রতিনিধিদের বিষয়টি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এ কথা ঠিক, এই ব্যবস্থা চালু করতে গেলে প্রথমেই দেশে ব্যাপকভিত্তিক ঋণচুক্তি বা কম্প্রিহেনসিভ ক্রেডিট অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে ডকুমেন্টেশনের কাজ সম্পন্ন করার ব্যবস্থা প্রচলন করতে হবে। বিষয়টি কিভাবে হতে পারে, তা সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে গেলে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন, যার সুযোগ এখানে সীমিত।

লেখক: সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

BBS cable ad

কনজুমার প্রোডাক্টস এর আরও খবর: