আসিয়ান প্লাস থ্রি জোটে চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসতে পারে ২০২৬ সালে।
গতকাল সিঙ্গাপুরভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা আসিয়ান প্লাস থ্রি ম্যাক্রোইকোনমিক রিসার্চ অফিসের (আমরো) প্রধান অর্থনীতিবিদ ডং হে এ আশঙ্কার কথা জানান। সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়, আসিয়ানভুক্ত দেশসহ চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া (আসিয়ান প্লাস থ্রি নামে পরিচিত) ব্লকের প্রবৃদ্ধি চলতি বছর ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে ব্লকটির প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। মূলত মার্কিন বাণিজ্য শুল্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাবেই এ নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
আমরোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হলে এবং বছরের বাকি সময় তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করলে প্রবৃদ্ধি আরো কমে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। এটি হবে ২০২২ সালের পর এ অঞ্চলের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি।
ওই বছর কভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব কাটিয়ে ওঠার সময় ৩ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখেছিল অঞ্চলটি। একই সঙ্গে বছর শেষে মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশের ওপরে উঠে যেতে পারে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ।
ডং হে বলেন, ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ঝুঁকির ভারসাম্য এখন নিম্নমুখী। তিনি জানান, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর তুলনায় ‘প্লাস থ্রি’ অর্থাৎ চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া মধ্যপ্রাচ্যের এ সংকটে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশেষ করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া জ্বালানি আমদানির জন্য পারস্য উপসাগরের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। যদিও সাময়িক সংকট মোকাবেলার জন্য এসব দেশে বড় ধরনের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি মূল্যবৃদ্ধি সামাল দেয়ার সক্ষমতা এসব রাষ্ট্রের নেই।
চীনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, চীন মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় অর্ধেক হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে সংগ্রহ করে। দেশটির কাছে স্থলপথে বিকল্প আমদানির ব্যবস্থা থাকলেও তা বিশাল এ চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও সিঙ্গাপুরের মতো নিট জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। জ্বালানির দাম বাড়লে এসব দেশে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়বে। যেসব দেশে জ্বালানি ভর্তুকি বা নিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে বাজারমূল্য ও সরকারি মূল্যের ব্যবধান বেড়ে যাওয়ায় সরকারের রাজস্ব ব্যয় বা ফিসক্যাল কস্ট বেড়ে যাবে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমরোর প্রধান অর্থনীতিবিদের পরামর্শ, ঢালাও ভর্তুকি না দিয়ে বরং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেয়া উচিত। তিনি সতর্ক করেন, ঢালাও ভর্তুকি বাজারের মূল্যের সংকেতকে বাধাগ্রস্ত করে এবং ভবিষ্যতে যুদ্ধ আরো গভীর হলে প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
আমরোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আসিয়ান প্লাস থ্রি অঞ্চলে চলতি বছর মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে, যা গত বছর ছিল দশমিক ৯ শতাংশ। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশে ভর্তুকি হ্রাসের উদ্যোগ এ মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ।
বিভিন্ন দেশের প্রবৃদ্ধির চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, চীন ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, জাপান দশমিক ৭ ভিয়েতনাম ৭ দশমিক ৪, মালয়েশিয়া ৪ দশমিক ৬, সিঙ্গাপুর ৩ দশমিক ৪, থাইল্যান্ড ১ দশমিক ৭ ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বাজার পর্যবেক্ষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত সেমিকন্ডাক্টরের ব্যাপক চাহিদা এবং সরকারি আর্থিক প্রণোদনা দক্ষিণ কোরিয়াকে এ সুবিধা দেবে।
তবে সব ঝুঁকির মধ্যেও আসিয়ান প্লাস থ্রি জোটের অর্থনীতির কিছু শক্তিশালী দিকের কথা উল্লেখ করেছেন ডং হে। তিনি জানান, ২০০০ সালের পর থেকে এশিয়ায় ‘এনার্জি ইনটেনসিটি’ বা অর্থনৈতিক উৎপাদনে জ্বালানি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ২০-৩০ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে চীনে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি এবং আসিয়ান অঞ্চলে এক-তৃতীয়াংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আসে।


