কাঁচাবাজার না সরিয়ে কারওয়ান বাজারে আধুনিক শপিং মল ও আড়ত চান ব্যবসায়ীরা
রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ পাইকারি কাঁচাবাজার কারওয়ান বাজার স্থানান্তরের লক্ষ্যে ১৩ বছর আগে আমিনবাজার, যাত্রাবাড়ী ও মহাখালীতে তিনটি বহুতল কাঁচাবাজার নির্মাণ করা হলেও এখনো সেখানে ব্যবসায়ীদের নেয়া যায়নি।
পর্যাপ্ত জায়গার অভাব, ব্যবসায়িক সুবিধা ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার বাস্তবতা বিবেচনায় স্থানান্তরে আপত্তি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। এর পরিবর্তে বর্তমান কারওয়ান বাজারেই আন্তর্জাতিক মানের বহুতল শপিং মল ও আধুনিক আড়ত নির্মাণের দাবি তুলেছেন তারা। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পর সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে।
ডিএনসিসির নথি অনুযায়ী, কারওয়ান বাজার স্থানান্তরের লক্ষ্যে ২০০৬ সালে ‘ঢাকা শহরের তিনটি পাইকারি কাঁচাবাজার নির্মাণ’ প্রকল্প অনুমোদন করে একনেক। অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন প্রায় ৩১১ কোটি টাকা ব্যয়ে আমিনবাজারে ৩৩ বিঘা, মহাখালীতে সাত বিঘা এবং যাত্রাবাড়ীতে পাঁচ বিঘা জমির ওপর তিনটি আধুনিক কাঁচাবাজার নির্মাণ করে। ২০১৩ সালে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর থেকেই ব্যবসায়ীদের স্থানান্তরের চেষ্টা শুরু হয়। তবে ব্যবসায়ীদের অনীহার কারণে সেই উদ্যোগ আর সফল হয়নি।
সীমিতসংখ্যক ব্যবসায়ীকে যাত্রাবাড়ীতে নেয়া সম্ভব হলেও অধিকাংশ দোকানই ফাঁকা থেকে যায়। ২০২৪ সালের মার্চ-এপ্রিলে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়া হলে সেটিও ব্যর্থ হয়। বর্তমানে মহাখালীর বাজার ভবনটি ডিএনসিসির হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে যাত্রাবাড়ী ও আমিনবাজারের বাজার ভবন কার্যত অলস পড়ে রয়েছে।
স্থানান্তর প্রক্রিয়া আবারো এগিয়ে নিতে গত ১৭ জুন ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে নগর ভবনে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কারওয়ান বাজার ২ নম্বর গ্রুপ কাঁচামাল আড়ত ব্যবসায়ী মালিক বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান চৌধুরী স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত বাতিল করে বর্তমান স্থানেই আধুনিক বহুতল আড়ত ও শপিং মল নির্মাণের দাবি জানান।
এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে সাইফুর রহমান চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা উন্নয়নের বিপক্ষে নই। কিন্তু কারওয়ান বাজার বহু বছর ধরে দেশের অন্যতম প্রধান পাইকারি কাঁচাবাজার হিসেবে গড়ে উঠেছে। এখানে পরিকল্পিত বহুতল শপিং মল ও আধুনিক আড়ত নির্মাণ করে বর্তমান ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন করা হলে ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—উভয়েই উপকৃত হবেন।’
ডিএনসিসির তথ্য অনুযায়ী, বিকল্প বাজারগুলোর মধ্যে আমিনবাজারে ৬৯৭টি, যাত্রাবাড়ীতে ১ হাজার ৮০টি এবং মহাখালীতে ১ হাজার ১৬৩টি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে যাত্রাবাড়ীতে ‘বিনা সালামিতে’ দোকান বরাদ্দের প্রস্তাবও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতেও ব্যবসায়ীদের আগ্রহ তৈরি হয়নি।
প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ডিএনসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (উপসচিব) মুহাম্মদ হাবিবুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত মার্কেটগুলো দীর্ঘদিন ধরে অলস পড়ে আছে। এটি সিটি করপোরেশনের জন্যও ক্ষতির কারণ। জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা ছাড়া শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগে পূর্ণাঙ্গ স্থানান্তর করা কঠিন। নির্বাচন শেষে সমন্বিত উদ্যোগে বিষয়টির গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে।’
স্থানান্তরের বিরোধিতা করে নগর পরিকল্পনাবিদদের একাংশও বর্তমান স্থানেই কারওয়ান বাজার পুনঃউন্নয়নের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের মতে, কারওয়ান বাজার শুধু একটি কাঁচাবাজার নয়; এটি রাজধানীর অন্যতম প্রধান পণ্য সরবরাহ কেন্দ্র। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ সবজি, ফল, মাছ ও অন্যান্য কৃষিপণ্য এখানে আসে। ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থানের কারণে এখান থেকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব। বাজারটি শহরের প্রান্তে সরিয়ে নেয়া হলে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে পড়তে পারে।


