৫ হাজার ৭৭৫ গ্রাহকের কাছে ৩ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ
বড় ঋণখেলাপিদের অনেকে পাচার করা অর্থে ইউরোপ, আমেরিকা, মালয়েশিয়া, দুবাই, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে স্থায়ী আবাস গড়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মাত্র ৫ হাজার ৭৭৫ গ্রাহকের কাছেই রয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। এ ঋণখেলাপিদের মধ্যে এগিয়ে রয়েছে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, চামড়া, জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙার মতো উৎপাদনমুখী শিল্প খাত। আবার খেলাপির তালিকায় ওপরের দিকে আছেন বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। ব্যাংক খাত তথা সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে খেলাপি ঋণ আদায় সদ্য নিয়োগ পাওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রথমবারের মতো ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়ায় গত বছরের জুনে। এর পরের তিন মাসে যোগ হয়েছে আরো ৩২ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের আকারের হিসাবে খেলাপির হারের চিত্র তুলে ধরে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, সংখ্যায় কম হলেও বড় ঋণ গ্রহীতারাই খেলাপি ঋণের বড় অংশের অংশীদার। সহজ কথায়, বড় ঋণ গ্রহীতারাই বড় খেলাপি। মধ্যম আকারের গ্রাহকদের কাছে থাকা খেলাপি ঋণের পরিমাণও বিপুল। অন্যদিকে সংখ্যায় অনেক বেশি হলেও ছোট গ্রাহকের খেলাপির পরিমাণ বেশ কম।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ১ কোটি টাকার নিচে ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছে এমন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক গ্রাহকদের সংখ্যা ছিল ৪৪ লাখ ২৮ হাজার ১৩৬। এ শ্রেণীর গ্রাহকদের কাছে থাকা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬১ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। ১ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়েছেন এমন ৩০ হাজার ১০৪ গ্রাহকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৩ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। আর ১০ থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণ নেয়া ৬ হাজার ৫৯৬ গ্রাহকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৫ হাজার ৪০ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে ২০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেয়া ৫ হাজার ৭৭৫ গ্রাহকের কাছেই রয়েছে ৩ লাখ ৪ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। এর মধ্যে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে এমন ১ হাজার ৭৪০ গ্রাহকের কাছে খেলাপি ঋণ রয়েছে ৪৩ হাজার ৫১ কোটি টাকার। ১ হাজার ৪৪ গ্রাহক ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে এবং তাদের খেলাপি ঋণ ৩৬ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। ৩২ হাজার ৫২৬ কোটি টাকার খেলাপি রয়েছে এমন ৭১৮ গ্রাহক ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। আর ৫০ কোটির বেশি ঋণ নিয়েছে এমন বড় গ্রাহকদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা। এ শ্রেণীর গ্রাহকের সংখ্যা মাত্র ২ হাজার ২৭৩। ৫০ কোটির বেশি ঋণের বিভাগে ধনিক শ্রেণীর এ গ্রাহকের গড় খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ১ কোটির নিচের ক্যাটাগরিতে গড় খেলাপি ঋণ মাত্র ১ লাখ ৩৯ হাজার টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রাহক সংখ্যার দিক থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি এমন ঋণ খেলাপির সংখ্যা ২ হাজারের বেশি দেখালেও বাস্তবতা হচ্ছে এসব কোম্পানির মালিকানা দেশের অল্প কিছু ব্যবসায়ীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। অনেক গ্রুপের মালিকানাধীন কোম্পানির সংখ্যা শতাধিক। এর মধ্যে বেনামি কোম্পানির সংখ্যা কম নয়। এমন বেনামি ও ভুইফোঁড় কোম্পানির নামে বের করে নেয়া ব্যাংক ঋণ এরই মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বেশ কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার ও বিশ্লেষক ফারুক মঈনউদ্দীন মনে করেন, যে ব্যাংকগুলো বেনামি কোম্পানির নামে ঋণ দিয়েছে, সেগুলোকে খেলাপি ঋণ বলা যায় না। এগুলোকে স্রেফ লুটপাট বলা উচিত। এসব ঋণ আর কখনো আদায়ের সম্ভাবনাও নেই। এ অবস্থায় বছরের পর বছর লুটপাটকৃত বেনামি ঋণ ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে বয়ে বেড়ানোর কোনো অর্থ হয় না। বরং এ ধরনের ঋণকে ব্যালান্স শিট থেকে বাদ দিয়ে ‘প্রোটেস্টেড বিল’-এ রূপান্তর করা দরকার। একই সঙ্গে প্রকৃত খেলাপি ঋণ আদায়ে সর্বাত্মক উদ্যোগ জরুরি।


