শিরোনাম

South east bank ad

টানা তিন বছর দুই অংকের উত্থান দেখল বৈশ্বিক শেয়ারবাজার

 প্রকাশ: ০২ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ন   |   বিশেষ সংবাদ

টানা তিন বছর দুই অংকের উত্থান দেখল বৈশ্বিক শেয়ারবাজার

টানা তৃতীয় বছরের মতো দুই অংকের প্রবৃদ্ধির দেখা পেল বৈশ্বিক শেয়ারবাজার। যদিও সদ্য বিদায় নেয়া বছরে নীতিগত তীব্র অনিশ্চয়তা, বাণিজ্য উত্তেজনা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাত ঘিরে অতিমূল্যায়নের আশঙ্কা ছিল প্রধান বাজারগুলোয়। এর মধ্যেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে সহায়তা করেছে শক্তিশালী করপোরেট আয় ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। তবে এ উত্থানের পেছনে অল্প কয়েকটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানির আধিপত্য থাকায় বাজারের টেকসই ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বিশ্লেষকদের মধ্যে। খবর এফটি।

যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক গত বছর প্রায় ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে, যা অনেক বিশ্লেষকের পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় সূচকটি একাধিকবার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। তবে বছরের শেষ দিন অর্থাৎ নিউ ইয়ারস ইভের লেনদেনে সূচকটি প্রায় দশমিক ৭৫ শতাংশ কমেছে। একই দিনে ইউরোপ ও এশিয়ার শেয়ারবাজারেও দেখা গেছে কিছুটা নিম্নমুখিতা।

উন্নত ও উদীয়মান উভয় ধরনের বাজারের বড় কোম্পানির শেয়ার নিয়ে সংকলিত এমএসসিএল অল কান্ট্রি ওয়ার্ল্ড ইনডেক্স গত বছর ২০ শতাংশের বেশি সম্প্রসারণ হয়েছে।

বার্কলেসের ইউএস ইকুইটিজ স্ট্র্যাটেজিক বিভাগের প্রধান ভেনু কৃষ্ণ বলেন, ‘২০২৫ সাল ছিল খুবই শক্তিশালী বছর। যতটা আশা করেছিলাম, তার চেয়েও বেশি ভালো করেছে সূচকগুলো। শুল্কসহ নানা নীতিগত অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও মোটের ওপর মার্কিন অর্থনীতি ও শেয়ারবাজার খুবই স্থিতিশীল থেকেছে।’

অবশ্য বছরের শুরুটা ওয়াল স্ট্রিটের জন্য খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। ওই সময় চীনা এআই স্টার্টআপ ডিপসিক স্বল্পমূল্যের লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) সিলিকন ভ্যালিকে চমকে দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের শেয়ারদর হঠাৎ পড়ে যায়। এরপর এপ্রিলে ট্রাম্পের বাণিজ্য শুল্কের ব্যাপকতা বৈশ্বিক বিনিয়োগ খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে এক প্রকার হকচকিত ভাব তৈরি করে। ফলে শেয়ার, বন্ড ও ডলার বিক্রির হিড়িক পড়ে যায়।

তবে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বিনিয়োগকারীদের দ্রুত শেয়ারবাজারে ফিরিয়ে আনে। বিশেষ করে মার্কিন করপোরেট খাতের শক্তিশালী আয় এবং ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদহার কমানোর সম্ভাবনা বাজারকে চাঙ্গা করে তোলে। একই সঙ্গে এআই-নির্ভর কোম্পানিগুলোর ওপর বড় বাজি ধরতে শুরু করেন বিনিয়োগকারীরা। মার্কিন অর্থনীতিতে প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুতগতি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে তোলে।

নর্ডিয়া অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ইকুইটি অ্যান্ড ফিক্সড ইনকাম বিভাগের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা কাসপার এলমগ্রিন বলেন, ‘বছরের শুরুতে যদি কেউ বলত, বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় পুনর্গঠন হবে। তাহলেও এমন শক্তিশালী শেয়ারবাজারের পূর্বাভাস দিতাম না। কিন্তু পরে আমরা স্থিতিশীল অর্থনীতি ও শক্তিশালী করপোরেট ভিত্তি দেখেছি।’

মার্কিন শেয়ারবাজারে বছরের শুরুতে ধাক্কা লাগায় অন্য অঞ্চলগুলো কিছুটা এগিয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই সে পারফরম্যান্স ধরে রাখা গেছে। গত বছর হংকং, জাপান, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির শেয়ারসূচকগুলো এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচককে ছাড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে উদীয়মান বাজারগুলোর শেয়ারের ওপর ভিত্তি করে সংকলিত বিস্তৃত এমএসসিআই সূচকও মার্কিন বাজারের তুলনায় ভালো করেছে।

অবশ্য কিছু বিনিয়োগকারী ও বিশ্লেষক ঊর্ধ্বমুখী এ প্রবণতার স্থায়িত্ব নিয়ে সতর্ক করছেন। কারণ এ উত্থানের বড় অংশ ছিল সিলিকন ভ্যালির কয়েকটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানির পারফরম্যান্স-নির্ভর। বুল মার্কেটে দীর্ঘদিনের তেজি ভাবের ফলে শেয়ারদর ঐতিহাসিক গড়ের অনেক ওপরে চলে গেছে এবং সূচকের রিটার্ন ক্রমেই অল্প কয়েকটি শেয়ারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

শ্রোডার্সের ভ্যালু ইকুইটি বিভাগের প্রধান সাইমন অ্যাডলার বলেন, ‘যখন বাজার এত শক্তিশালী থাকে, তখন আত্মতুষ্টির ঝুঁকি তৈরি হয়। ২০২৬ সালে আমরা এমন এক সময়ে প্রবেশ করছি, যখন বাজারের অনেক অংশই অতিরিক্ত মূল্যায়িত বলে মনে হচ্ছে। উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বড় ধরনের দরপতনের ঝুঁকি।’

সাইমন অ্যাডলারের ভাষ্যমতে, ‘মার্কিন শেয়ারবাজারে প্রচলিত শিলার সাইক্লিক্যালি অ্যাডজাস্টেড প্রাইস-টু-আর্নিংস (সিএপিই) অনুপাত ২০২৫ সালের শেষে প্রায় ৪০-এ দাঁড়িয়েছে। বিষয়টিতে স্পষ্ট যে পুঁজিবাজারে কোম্পানিগুলো অতিমূল্যায়িত। ২০০০-এর দশকের শুরুতে ডটকম বুদবুদ ফেটে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তেই শুধু এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে সিএপিই অনুপাত এত বেশি দেখা গিয়েছিল। এত উচ্চ মূল্যায়িত বাজার কখনই বিনিয়োগকারীদের মূল্যস্ফীতির তুলনায় অতিরিক্ত প্রকৃত রিটার্ন দিতে পারেনি।’

ব্যাংক অব আমেরিকার ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজিক এলিয়াস গালু বলেন, ‘এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর জন্য টানা চার বছর দুই অংকের রিটার্ন দেয়া খুবই বিরল ঘটনা। এটা অসম্ভব নয়, কিন্তু বাধাটা খুবই উঁচু। আমরা বছর শুরু করছি অতি উচ্চ মূল্যায়ন থেকে।’

স্টেট স্ট্রিট ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের ইউরোপ অঞ্চলের ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড রিসার্চ প্রধান আলতাফ কাসামও ঊর্ধ্বমুখী বাজারে অল্প কয়েকটি কোম্পানির শেয়ার-নির্ভর হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে কথা বলেছেন। ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ হিসেবে আখ্যায়িত সাত প্রযুক্তি জায়ান্ট কোম্পানি (অ্যালফাবেট, অ্যামাজন, অ্যাপল, মেটা, মাইক্রোসফট, এনভিডিয়া ও টেসলা) এখন উন্নত বাজারের বৈশ্বিক শেয়ারের সূচক এমএসসিআই ওয়ার্ল্ড ইনডেক্সের প্রায় এক-চতুর্থাংশ দখল করে আছে।

বাজারে বাড়তে থাকা এ কেন্দ্রীভবন এআই খাতে চুক্তি ও অধিগ্রহণের জোয়ার নিয়েও সতর্কতা তৈরি করেছে। কারণ এর মধ্য দিয়ে আর্থিক নির্ভরতার এক জটিল জাল তৈরি হয়েছে। যেমন চ্যাটজিপিটির প্যারেন্ট ওপেনএআই কিছু অবকাঠামো সরবরাহকারী কোম্পানির অংশীদারত্ব কিনে নিয়েছে এবং আবার তাদের কাছ থেকেই বড় অংকের বিনিয়োগ পেয়েছে।

BBS cable ad