নিরহংকার একজন ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ
ইকরামউজ্জমান
বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান
স্বাধীন বাংলাদেশে বৃহত্তর সামাজিক পরিমণ্ডলে এবং ক্রীড়াঙ্গনের যাপিত জীবনে যে মানবদরদি এবং ক্রীড়াপ্রেমিক ব্যক্তিত্ব অনুপ্রেরণা ও অনুকরণীয় ভূমিকার মাধ্যমে নিজেকে ব্যতিক্রমী হিসেবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন এবং পেরেছেন ভিন্নধর্মী প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করতে বৃহত্তর সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে— তিনি হলেন দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্প গ্রুপ বসুন্ধরার চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান।
আদ্যোপান্ত বাঙালি, আধুনিকীকরণে বিশ্বাসী এই দেশপ্রেমিক ব্যক্তিত্ব বছরের পর বছর ধরে একটি দর্শনকে বুকের মধ্যে লালন করেছেন— সেটি হলো সর্বক্ষেত্রে একমাত্র ও প্রধান অধিকার হলো সবার আগে বাংলাদেশ। তিনি বিশ্বাস করেন, কোনো একক ক্ষেত্র নয়, সকল ক্ষেত্রে উন্নতি হলেই বিশ্বদরবারে জাতি হিসেবে আমাদের মর্যাদা বাড়বে। আর এর জন্য তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে বসুন্ধরা গ্রুপ দেশ ও মানুষের কল্যাণে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে কাজ করে যাচ্ছে।
স্বপ্নবাজ, আত্মপ্রত্যয়ী এবং ইতিবাচক মানসিকতাসম্পন্ন এই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব বিশ্বাস করেন, যত বাধা-বিঘ্ন আসুক না কেন, অনেক রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা থামবে না। বাংলাদেশ ক্রমশ এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ জয়ী হবে। উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হবে।
এগিয়ে যাবে বিভিন্ন সূচকে। এখনকার তারুণ্যের শক্তি হলো দেশপ্রেম, সততা ও এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা। তাঁরাই দেশের আগামীর সম্ভাবনা। তারা কখনো পরাজিত হবে না, হতে পারে না।
বাস্তববাদী ও আন্তরিক উদ্যোগে বিশ্বাসী আহমেদ আকবর সোবহানের বর্ণাঢ্য জীবনের গল্প ধারাবাহিকতার সঙ্গে সত্যি অসাধারণ। অসীম ধৈর্য, অবিচল আস্থা এবং সীমাহীন সহ্যশক্তির অধিকারী এই মানুষটি সম্পূর্ণভাবে অহংকারহীন বা নিরহংকার। তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেও বরাবর নিজেকে আড়ালে রাখতে ভালোবাসেন। এগিয়ে দেন সহকর্মীদের। তিনি সমুন্নত রেখেছেন পেশাদারি ম্যানেজমেন্টের আদর্শকে।
কখনো এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি, যা বাস্তবায়ন করা সাধ্যের বা ক্ষমতার বাইরে। আর এই বিষয়টি তাঁকে এবং তাঁর প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম করেছে। বৃহৎ ‘করপোরেট’ প্রতিষ্ঠানে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে তিনি উদাহরণ হতে পেরেছেন। দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে তার স্থান অম্লান হয়েছে, উজ্জ্বল হয়েছে।
অত্যন্ত ব্যস্ত ও বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এই ব্যক্তিত্বের মনপ্রাণজুড়ে আছে খেলাধুলার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং অনুরাগ। ক্রীড়াঙ্গন আর দেশের খেলাধুলার স্বার্থে তিনি আপস করতে রাজি নন। সুস্থ জীবনবোধসম্পন্ন ক্রীড়াঙ্গন আর তার অনুকরণীয় শিক্ষায় তিনি শিক্ষিত এবং দীক্ষিত। শুধু দেশের ক্রীড়াঙ্গনের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল এবং বিভিন্ন খেলার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। যার নজির এ দেশে দ্বিতীয়টি নেই। তিনি পরিচিত হয়েছেন ‘পায়োনিয়ার’ হিসেবে। আদি নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায়। বাবা আলহাজ আবদুস সোবহান ছিলেন ঢাকা হাইকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী। বাবার ছিল আরেক পরিচিতি। তিনি ছিলেন অল ইন্ডিয়া সাঁতারে চ্যাম্পিয়ন। মা উম্মে কুলসুম ছিলেন গৃহিণী। দুই ভাই চার বোন। বড় ভাই আবদুস সাদেক কিংবদন্তী হকি ও ফুটবল খেলোয়াড়। খেলাধুলায় তাঁর অনুরাগ ‘জেনেটিক’ বা বংশানুক্রমিক। ছাত্র জীবনে নিয়মিতভাবে হকি খেলেছেন তিনি। স্কুলজীবন কেটেছে আরমানিটোলা উচ্চ বিদ্যালয়ে। যাকে দেশের হকির সূতিকাগার মনে করা হয়। খেলেছেন আজাদ স্পোর্টিং, ব্যাচেলার স্পোর্টিং এবং বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে হকি লীগে। যুব হকিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান দলের হয়ে খেলেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিজ জেলার হয়ে জাতীয় হকিতে অংশ নিয়েছেন। হকি ছাড়াও অন্য খেলার প্রতিও ছিল অনুরাগ। সব সময় রেখেছেন ফুটবল, ক্রিকেট, হকি এবং অন্য খেলার আন্তর্জাতিক খোঁজখবর। এখনো সেই অভ্যাসে রাত জেগে খেলা দেখতে দ্বিধা করেন না। আর দেশের খেলা হলে তো কথাই নেই। সব কিছু বাদ দিয়ে খেলার চত্বরে তার চোখ দুটো লেপ্টে যায়। বিশেষ করে ফুটবলে। খেলা দেখতে বসেও তার আগ্রহ এবং কৌতূহল অবাক করার মতো শুনেছি।
আহমেদ আকবর সোবহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাঁর উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি অসাধারণ। তিনি মানুষকে পড়তে পারেন, বুঝতে পারেন সঠিকভাবে।
গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর কার্যকলাপ সংক্ষেপে আলোকপাত করা সম্ভব নয়। তিনি তো সর্বক্ষেত্রে সব কিছুতে কাছ থেকে আছেন সবার অভিভাবক হিসেবে। তাঁর চিন্তা-ভাবনা সব সময় নাড়া দিচ্ছে।
গত বছর (২০২৫) ১০ জানুয়ারি কালের কণ্ঠের ১৫তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর প্রাক্কালে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পাঁচ সাংবাদিকদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ও কালের কণ্ঠের সেরা কর্মীদের দেওয়া সম্মাননা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন ‘সত্য যত অপ্রিয় হোক, সেটা আপনারা বলেন। এতে সমগ্র দেশ, সমগ্র জাতি উপকৃত হবে। কী চমৎকার আবেদনময়ী একটি উপদেশ।
বাংলাদেশের যথার্থ পেশাদারিত্বের বীজ বপন করেছেন বসুন্ধরা কিংসের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। তার ফসল হলো বসুন্ধরা বিশাল স্পোর্টস কমপ্লেক্স। বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটিতে কী নেই? আন্তর্জাতিক মানের বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনা। যেখানে নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ক্রমেই প্রশস্ত ফুটবলের প্র্যাকটিস মাঠ। ফুটবল ও ফুটসাল, ইনডোর ও আউটডোর ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন (২৪টি কোর্ট) প্যাডেল, হকি, শুটিং, স্কোয়াশ, বাস্কেটবল, ভলিবল, লন টেনিস, স্কেটিং, কাবাডি, ইয়োগা, গোল্ডস জিম, অলিম্পিক সাইজ সুইমিং পুল, স্পা (সাউথ স্টিম রুম, আইস রুম, হিমালয়ান সল্ট রুম, কোল্ড প্লাঞ্জ, অনসেল হট পুল, এক্সপেরিয়েন্স শাওয়ার) জুলকান ইনডোর অ্যারেনা (মুয়াথাই, বক্সিং, এমএমএ, কিক বক্সিং, তায়কোয়ান্দো, পাওয়ার লিফটিং স্ট্রং গ্রাম, আর্ম রেসলিং, রক ক্লাইম্বিং, রোপ ক্লাইম্বিং)।
বিশাল স্পোর্টস কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পেছনে যে চিন্তাটি প্রথম থেকেই কাজ করেছে ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণব্যবস্থার সম্প্রসারণ। স্পোর্টস ইকোনমি বা ক্রীড়া অর্থনীতিকে উৎসাহিত করা। তিনি আরেকটি বিষয়ে সব সময় আলোকপাত করেছেন, সেটি হলো— খেলার মাঠ চাই।
বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানের একটি স্বপ্ন ছিল— বিশাল প্রশস্ত খেলা চত্বরে বসুন্ধরা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠা করা। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে গত বছর জানুয়ারি মাসে মুক্ত পরিবেশে। দেশে আর কোনো স্কুল-কলেজ নেই, যেখানে ছেলে ও মেয়েরা পড়াশোনা করার পাশাপাশি অনেকগুলো খেলার সুযোগ পাচ্ছে।
সামাজিক দায়বদ্ধতাকে বাস্তবায়িত করার জন্য বসুন্ধরা শুভসংঘ গড়ে তোলা হয়েছে। এটি বসুন্ধরা গ্রুপ চেয়ারম্যানের একটি অসাধারণ উদ্যোগ। এখানে দরিদ্র নারী-পুরুষদের আত্মকর্মসংস্থান, আত্মনির্ভর এবং স্বাবলম্বী করার বিরামহীন উদ্যোগ বছরজুড়ে চলে। শত শত ছেলে-মেয়ে বসুন্ধরা শিক্ষাবৃত্তির সাহায্য পেয়ে শুধু তাদের লেখাপড়া অব্যাহত রাখতে সক্ষম হননি— সমাজজীবনে ভালোভাবে বিভিন্ন পেশায় এখন তারা প্রতিষ্ঠিত। এ ছাড়া ‘বসুন্ধরা শুভসংঘ’ সমাজজীবনে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়িত করে চলেছে বিরামহীনভাবে।
আহমেদ আকবর সোবহান একজন মানবতাবাদী, ক্রীড়াপ্রেমিক এবং একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব, যিনি মানুষকে নিয়ে ভাবেন, মানুষের মঙ্গল চান, মানুষের পাশে দাঁড়ান।
লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন। প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া।


