চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৯ শতাংশ যায় ব্যক্তির পকেট থেকে
দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা ক্রমেই পশ্চাৎমুখী হয়ে পড়ছে। সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা এখনও বড় সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৯ শতাংশই ব্যক্তির পকেট থেকে যাচ্ছে। গরিব মানুষের মোট আয়ের ৩৫ শতাংশই যায় চিকিৎসায়। ক্যান্সার কিংবা কিডনি রোগের মতো দুরারোগ্য ব্যাধির বড় ব্যয়ের কারণে বহু পরিবার দারিদ্র্যসীমায় নেমে গেছে। অসংখ্য পরিবার আছে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেশের স্বাস্থ্য খাতের এমন চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিআইডিএসের সম্মেলন কক্ষে ‘বাংলাদেশে অপূরণীয় স্বাস্থ্যসেবা চাহিদা ও ব্যক্তির পকেট থেকে ব্যয়ের বিষয়ে পুনর্ভাবনা’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
এ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সভাপতিত্ব করেন। প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো ড. আবদুর রাজ্জাক সরকার।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যন ব্যুরোর ২০২২ সালে পরিচালিত সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য পর্যালোচনা ও নতুন করে ৬২ হাজার ৩৮৭ জনের ওপর স্বাস্থ্যবিষয়ক চাহিদা ও চিকিৎসার উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যেমে গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। এতে বলা হয়, ১৯৯৭ সালে চিকিৎসায় ব্যক্তির পকেট থেকে ব্যয়ের হার ছিল ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ। বাকিটা রাষ্ট্র ব্যয় করত। ২০২০ সালে এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশে।
বিআইডিএসের গবেষণায় দেখা যায়, জরিপকালে ৬৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন, চিকিৎসার চাহিদা পূরণ হয়নি। উচ্চ ব্যয়, পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব, রোগের ভয়, কিংবা চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার মতো সহায়তাকারী না থাকায় তাদের চিকিৎসা নেওয়া হয়নি। চিকিৎসা বঞ্চিতদের মধ্যে গ্রাম-শহর ব্যাবধানও বেশ স্পষ্ট। গ্রামের ৬৮ শতাংশের বিপরীতে শহরের ৫৯ শতাংশ রোগীর চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন অপূরণীয় থাকে।
চিকিৎসাসেবায়ও আঞ্চলিক বৈষম্যচিত্র বেশ স্পষ্ট। বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজশাহী বিভাগে চিকিৎসা না পাওয়ার হার সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৭৩ শতাংশ। সিলেটে এ হার ৭০ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে চট্টগ্রামে তুলনামূলক কম, প্রায় ৫১ শতাংশ। জেলাভিত্তিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। নড়াইলে অপূর্ণ চিকিৎসা চাহিদার হার ৮১ শতাংশ। বিপরীতে ফেনীতে এ হার সবচেয়ে কম, ১৮ শতাংশ।
চিকিৎসা ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি পরিবারের গড়ে প্রতি মাসে চিকিৎসা ব্যয় ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা, যা পরিবারের মোট ব্যয়ের ১১ শতাংশ। দরিদ্র পরিবারগুলোর মোট আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যয়ে চলে যাচ্ছে। ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৫ শতাংশ। শহরাঞ্চলের পরিবারগুলো গড়ে মাসে ৪ হাজার ১৯২ টাকা চিকিৎসায় ব্যয় করছে, যেখানে গ্রামে এ ব্যয় ৩ হাজার ১০৯ টাকা। ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালে চিকিৎসায় গড়ে ব্যয় হয় প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার টাকা। হৃদরোগে গড়ে প্রায় ১ লাখ টাকা ও কিডনি রোগে প্রায় ৬৩ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এমনকি সাধারণ দুর্ঘটনা বা আঘাতজনিত চিকিৎসাতেও গড়ে ৪৪ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে।
চিকিৎসা সেবায় ব্যয়ের খাত প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ক্ষেত্রে ওষুধ, রোগ নির্ণয় পরীক্ষা, অস্ত্রোপচার এবং শয্যা ভাড়া সবচেয়ে বড় ব্যয় খাত। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মোট ব্যয়ের ২৬ শতাংশই যাচ্ছে ওষুধে, ১৭ শতাংশ রোগ নির্ণয় পরীক্ষায় এবং ২৩ শতাংশ অস্ত্রোপচারে।
স্বাস্থ্য খাতের এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিআইডিএসের গবেষণায় বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে– দ্রুততম সময়ের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। এছাড়া স্বাস্থ্য বীমাভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা জাতীয় উন্নয়নের প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ খাত। তবে এই দুই খাতের উন্নয়ন মানে কেবল সুন্দর ভবন নয়। মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্য কার্ড চালুর চিন্তা
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান কর্মসূচি সঠিক অবস্থায় নেই। কর্মসূচি বাস্তবায়ন, মনিটরিং ও উন্মুক্ত উপাত্তের ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় পৃথক তিনটি কাঠামো করার প্রয়োজন রয়েছে। আইনের শাসন প্রয়োজন। মানবিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই প্রধানমন্ত্রীর ‘উই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’-এর অংশ।
তিনি বলেন, নাগরিকদের জন্য হেলথ কার্ড চালুর চিন্তা করছে সরকার। এর মধ্যে পুষ্টির বিষয়টিও নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে। উপদেষ্টা বলেন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বাজেটের মোট বরাদ্দের ৫ শতাংশ প্রদান ও এই অর্থ পুরোপুরিই যেন ব্যয় হয় সেই চেষ্টা থাকবে। সংশোধিত বাজেটে পুরোটা ব্যয় হলে জাতীয় বৈষম্য কমে আসবে।


