ক্ষতিপূরণ পাবেন পাঁচ ব্যাংকের ক্ষতিগ্রস্ত শেয়ারহোল্ডাররা
একীভূত করা পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের ক্ষতিগ্রস্ত শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তবে প্রক্রিয়াটি জটিল হওয়ায় হিসাবনিকাশ করে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান তিনি। গতকাল সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন অর্থ উপদেষ্টা।
পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার সময় সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে জানতে চাইলে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা এটা বিবেচনা করব। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর তার মতো করে বলেছেন। তবে আমরা বলেছি, অবশ্যই যারা আমানতকারী, যাদের টাকা আছে, সবাই পাবেন।’
শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়টি চ্যালেঞ্জিং উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একীভূত ব্যাংকগুলোর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিট সম্পদমূল্য নেতিবাচক। যে কারণে শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ দেয়া কারিগরি ও জটিল বিষয়। শেয়ারহোল্ডাররা হয়তো বাজারের সংকেত দেখে শেয়ার কিনেছেন। দেখা যাক কতটুকু কী করা যায়।’
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘কীভাবে ক্ষতিপূরণ দেব সেটা নিয়ে কাজ হচ্ছে। অবশ্যই পরবর্তী অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন। ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা যখন নেতিবাচক হয়ে যায়, তখন পুরো দায় একতরফাভাবে শেয়ারহোল্ডারদের ওপর চাপিয়ে দেয়া যৌক্তিক নয়।’
সেক্ষেত্রে কি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত শেয়ারহোল্ডাররা পাবেন? এমন প্রশ্ন করলে সালেহউদ্দিন বলেন, ‘কীভাবে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে তার মডেল তৈরি করতে একটু সময় লাগবে। ধরেন কেউ বহু টাকার শেয়ার কিনেছেন, তাকে আংশিকভাবে শেয়ার দেয়া হতে পারে বা বাকিটুকু হয়তো ক্ষতিপূরণ দেয়া হতে পারে। ওটা একটু হিসাব করতে হবে। কারণ বার্ডেনটা (বোঝা) তো পুরোটা শেয়ারহোল্ডাররা নিতে পারেন না।’
অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে নিতে আগামী সরকারকে একাধিক কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বলে জানিয়েছেন ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। দেশের শিল্পভিত্তি এখনো দুর্বল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশটি এখনো সীমিত কয়েকটি রফতানি খাতের ওপর নির্ভরশীল। হংকং বা সিঙ্গাপুরের মতো মডেলে বাংলাদেশ এগোতে পারবে না, বরং দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) শক্তিশালী করাই বাস্তবসম্মত পথ।’
মূল্যস্ফীতিকে বহুমাত্রিক সমস্যা উল্লেখ করে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি এখনো একটি বড় চাপ। শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি মূল্য ও বাজার ব্যবস্থাপনা—সবকিছু মিলিয়েই মূল্যস্ফীতি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমরা চেষ্টা করেছি, কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নীতির বিষয়।’
ব্যাংক খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শুধু এককালীন কোনো সিদ্ধান্তে এ খাতের সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে ধারাবাহিক সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।’
পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট নিয়ে তিনি বলেন, ‘পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী না করলে ব্যবসা-বাণিজ্য দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকনির্ভরই থেকে যাবে। শুধু ব্যাংকের ঋণের ওপর নির্ভর করে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট টেকসই হতে পারে না।’
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কার্যকর করা সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে, তবে নীতিগত সংস্কার পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। করনীতি নিয়ে একটি গাইডলাইন রিপোর্ট রেখে যাওয়া হচ্ছে, যা পরবর্তী সরকার ব্যবহার করতে পারবে।’
জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, অফশোর ড্রিলিং এবং বিকল্প জ্বালানি বিশেষ করে সৌরশক্তি উন্নয়নে আরো জোর দিতে হবে। সৌর জ্বালানির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ খাতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।’
পাচার করা অর্থ উদ্ধার প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘কারা, কোন দেশে অর্থ পাচার করেছে সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে বিদেশ থেকে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ। ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এখন দরকার সরকারি সংস্থা ও এজেন্সিগুলোর মধ্যে সমন্বয়।’
অর্থনৈতিক সংস্কার ও নীতিগত উদ্যোগ বাস্তবায়নে নানা সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে নিজের কাজের মূল্যায়নে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৭০ বা ৮০-এর বেশি দিতে চান না অর্থ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আমি বাস্তববাদী মানুষ। নিজেকে ১০০ নম্বর কেন দেব? আমাদের অনেক ইচ্ছা ছিল, অনেক কাজ শুরু করেছি, কিন্তু সব শেষ করতে পারিনি। তাই ৭০ বা ৮০-এর বেশি দিতে রাজি নই।’


