কারসাজি রোধে রিয়েল টাইম সার্ভেইল্যান্স চালুর ওপর গুরুত্বারোপ
পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাজার তদারকি ব্যবস্থার আধুনিকায়নে গুরুত্বারোপ করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
বাজার কারসাজি প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মানের রিয়েল-টাইম সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা চালু ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো আরো শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
এ লক্ষ্যে গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি ভবনে কমিশনের সঙ্গে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসির (ডিএসই) সার্ভেইল্যান্স টিমের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএসইসির চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) তানভীর হাবিব রহমান, কমিশনার নাহিদ মাহতাব, কমিশনার মো. নাফিজ আল তারিক, কমিশনের নির্বাহী পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ডিএসইর পক্ষে অংশ নেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার ও চিফ রেগুলেটরি অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া।
বৈঠকে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থা, বাজারের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং অনিয়ম-কারসাজি প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ডিএসই বাজার কারসাজি শনাক্ত ও প্রতিরোধে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলোর অগ্রগতি কমিশনের সামনে তুলে ধরা হয়।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কেবল আইনগত ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; বরং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও তাৎক্ষণিক তথ্য বিশ্লেষণ সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এ কারণে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম অনুশীলনের আলোকে স্টক এক্সচেঞ্জের সার্ভেইল্যান্স কার্যক্রমকে আরো কার্যকর ও আধুনিক করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে অতীতে বিভিন্ন সময়ে কারসাজি, অস্বাভাবিক শেয়ারদর বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ তথ্যের অপব্যবহারের অভিযোগ বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এমন বাস্তবতায় রিয়েল-টাইম সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে সন্দেহজনক লেনদেন দ্রুত শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে। এতে বাজারের স্বচ্ছতা বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত হবে।
বৈঠকে বিএসইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে কমিশন বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্য অর্জনে স্টক এক্সচেঞ্জ, বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজারের সার্ভেইল্যান্স সিস্টেমের আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা গেলে বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সহজ হবে। একই সঙ্গে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গতকালের পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি: গতকাল লেনদেনের শুরুর পর থেকে কিছুটা নিম্নমুখী অবস্থানে ছিল পুঁজিবাজার। দিন শেষে ডিএসইএক্স সূচক ২১ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৬৪০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, আগের কার্যদিবসে যা ছিল ৫ হাজার ৬৬১ পয়েন্ট। নির্বাচিত কোম্পানির সূচক ডিএস-৩০ দিনের ব্যবধানে প্রায় ২ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১৪৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, আগের কার্যদিবসে যা ছিল ২ হাজার ১৪৩ পয়েন্টে। শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস এদিন ২ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১৪৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, আগের কার্যদিবসে যা ছিল প্রায় ১ হাজার ১৫১ পয়েন্ট। গতকাল সূচকের উত্থানে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, গ্রামীণফোন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি (বিএটিবিসি) ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের শেয়ার।
ডিএসইতে গতকাল ১ হাজার ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার সিকিউরিটিজ হাতবদল হয়েছে, আগের কার্যদিবসে যা ছিল ১ হাজার ১৯৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। গতকাল এক্সচেঞ্জটিতে লেনদেন হওয়া ৩৯৬টি কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড ও করপোরেট বন্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৭১টির, কমেছে ২৯৮টির ও দর অপরিবর্তিত ছিল ২৭টির।
খাতভিত্তিক লেনদেনচিত্রে দেখা যায়, গতকাল ডিএসইর মোট লেনদেনের ১৩ শতাংশ দখলে নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে ওষুধ ও রসায়ন খাত। ১২ দশমিক ৫ শতাংশ দখলে নিয়ে তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে প্রকৌশল খাত। বস্ত্র খাত ১১ দশমিক ৮ শতাংশ লেনদেনের ভিত্তিতে তালিকার তৃতীয় অবস্থানে ছিল। ১০ দশমিক ২ শতাংশ লেনদেনের ভিত্তিতে তালিকার চতুর্থ স্থানে ছিল ব্যাংক খাত। আর পঞ্চম অবস্থানে থাকা সাধারণ বীমা খাতের দখলে ছিল লেনদেনের ৯ দশমিক ৪ শতাংশ।
গতকাল ডিএসইতে টেলিযোগাযোগ খাতের শেয়ারে সবচেয়ে বেশি ১ দশমিক ৩ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন এসেছে। এছাড়া ওষুধ ও রসায়ন খাতে দশমিক ৫ শতাংশ এবং খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতে দশমিক ৩ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন ছিল। অন্যদিকে গতকাল সেবা খাতের শেয়ারে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ, বিবিধ খাতে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ ও সাধারণ বীমা খাতে ২ দশমিক ১ শতাংশ নেতিবাচক রিটার্ন এসেছে।
সিএসইর নির্বাচিত সূচক সিএসসিএক্স গতকাল ৬২ পয়েন্ট কমে ৯ হাজার ৩২৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। সিএসইর সব শেয়ারের সূচক সিএএসপিআই এদিন ১০৪ পয়েন্ট কমে ১৫ হাজার ২৫০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এদিন এক্সচেঞ্জটিতে লেনদেন হওয়া ২২৬টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৬৯টির, কমেছে ১৩৬টির ও দর অপরিবর্তিত ছিল ২১টির।


