হালাল পণ্যের ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি এখনো ১ বিলিয়নের নিচে
বিশ্বজুড়ে হালাল অর্থনীতির আকার ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বিশাল এ বাজারে বাংলাদেশ বছরে মাত্র ৮৫০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রফতানি করে।
এ প্রেক্ষাপটে দেশের রফতানি বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়াতে এ বাজারকে অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার ও আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে হালাল পণ্যের বাজারে বাংলাদেশ দ্রুত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) উদ্যোগে গতকাল রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিসিআই বোর্ড রুমে এক কর্মশালায় ব্যবসায়ী, গবেষক ও রফতানিকারকদের আলোচনায় এ তথ্য উঠে আসে। ‘হালাল ফর এক্সপোর্ট ডাইভার্সিফিকেশন’ শীর্ষক এ কর্মশালায় বক্তারা একক সার্টিফিকেশন কর্তৃপক্ষ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, আধুনিক পরীক্ষাগার, ট্রেসেবিলিটি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ হাসান আরিফ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির (আইইউবিএটি) বিজনেস স্কুলের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মোমিনুল ইসলাম। এছাড়া আলোচক হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সাবেক সভাপতি শাব্বির এ খান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. দীন ইসলাম।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, ‘বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির বাজার বর্তমানে ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে বাংলাদেশ এখনো মূলত খাদ্য ও কৃষিভিত্তিক হালাল পণ্য রফতানিতেই সীমাবদ্ধ। অথচ কসমেটিকস, ফার্মাসিউটিক্যালস, ফ্যাশন, পর্যটন, ম্যানুফ্যাকচারিং সাপ্লাই চেইন, ফিনটেক, শিক্ষা ও গবেষণাসহ আরো বহু খাতে বড় সম্ভাবনা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের হালাল খাতের প্রধান সমস্যা সমন্বয়হীনতা। আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একক সার্টিফিকেশন কর্তৃপক্ষ না থাকায় রফতানিকারকরা সমস্যায় পড়ছেন।’ এ প্রেক্ষাপটে দেশে মালয়েশিয়া বা তুরস্কের মতো একটি স্বীকৃত কর্তৃপক্ষ গঠনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘বাংলাদেশের হালাল পণ্যের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও হালাল সার্টিফিকেশন ও এ খাতের সুযোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতা নেই। দ্রুত এ খাতে গুরুত্ব দিলে রফতানি, কর্মসংস্থান ও দেশীয় শিল্পে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
তিনি আরো বলেন, ‘২০৩৪ সালে বৈশ্বিক হালাল বাজার প্রায় ৯ দশমিক ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের ওষুধ, টেক্সটাইল ও কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন খাতের রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।’
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় ড. মো. মোমিনুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে হালাল পণ্যের বাজার ক্রমাগত বড় হলেও বাংলাদেশ এখনো এ বিশাল খাতের সুফল পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারেনি। রফতানি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশ থেকে রফতানীকৃত হালাল বা হালাল হিসেবে চিহ্নিত পণ্যের বার্ষিক আর্থিক মূল্য মাত্র ৮৫০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সম্ভাবনাময় এ খাতটি এখনো ১ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেনি, যা বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় বেশ কম।’
তিনি বলেন, ‘হালাল শুধু খাদ্য নয়; প্রসাধনী, ওষুধ, ফ্যাশন, পর্যটন ও আর্থিক সেবাসহ বিভিন্ন খাতের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, বিদ্যমান শিল্পভিত্তি ও মূল্য সংযোজন সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এ বাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।’
আলোচনায় বিএমসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শাব্বির এ খান বলেন, ‘হালাল পণ্যের রফতানি বাড়াতে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন ভোক্তা সচেতনতা ও টেকসই কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা।’ এজন্য স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত হালাল বিষয়ে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অধ্যাপক ড. মো. দীন ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২৫ হাজার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২০ লাখ হালাল পণ্য রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে হালাল সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩০০টি এবং রফতানিযোগ্য পণ্য ৬০০-৭০০-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ।’ এজন্য শুধু হালাল সনদই যথেষ্ট নয়; আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি, প্রয়োজনীয় টেস্টিং সুবিধা ও আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উন্মুক্ত আলোচনায় ইজি প্রসেস ফুডের চেয়ারম্যান জিয়া হায়দার মিঠু বলেন, ‘বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে হালাল সনদ নিতে উদ্যোক্তাদের পরিদর্শন-সংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যয় ও রফতানির ওপর পরিমাণভিত্তিক ফি দিতে হয়, যা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা।’ এজন্য সহজ শর্তে, বিনা ফিতে বা স্বল্প ব্যয়ে হালাল সনদ, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানান এ উদ্যোক্তা।


