শিরোনাম

South east bank ad

বিশ্বব্যাপী অদক্ষতার সূচকই চট্টগ্রাম বন্দরের আয়ের বড় উৎস

 প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ন   |   আমদানী/রপ্তানী

বিশ্বব্যাপী অদক্ষতার সূচকই চট্টগ্রাম বন্দরের আয়ের বড় উৎস

জাহাজ থেকে খালাস হয়ে কত দ্রুত কনটেইনার বন্দর ত্যাগ করতে পারছে সেটিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একটি বন্দরের দক্ষতা নির্ধারণের অন্যতম সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব কাঠামো পর্যবেক্ষণে মিলছে ভিন্ন এক চিত্র। নতুন ট্যারিফ কার্যকর হওয়ার পর প্রতি টিইইউ কনটেইনার থেকে বর্তমানে বন্দরের গড়ে আয় হচ্ছে ১৫২ ডলার। আর এর প্রায় এক-চতুর্থাংশই আসছে স্টোর রেন্ট তথা কনটেইনার দীর্ঘ সময় বন্দরে পড়ে থাকার বিপরীতে আদায় করা মাশুল থেকে। ফলে যে সূচকটিকে বৈশ্বিকভাবে অদক্ষতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেটিই হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম বন্দরের আয়ের বড় উৎস। এ চিত্র বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম বন্দরের কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম থেকে অর্জিত রাজস্বের ওপর ভিত্তি করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ মাসে প্রতি টিইইউ (টোয়েন্টি ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) আয়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বন্দরের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজস্ব উৎস হয়ে উঠেছে স্টোর রেন্ট। এ পাঁচ মাসের হিসাবে প্রতি টিইইউতে গড়ে ৩৪ দশমিক ২৫ ডলার আয় হয়েছে, যা বন্দরের মোট পরিচালন রাজস্বের ২২ দশমিক ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ বন্দরের ভেতরে কনটেইনারের অবস্থানকাল যত দীর্ঘ হয়েছে স্টোর রেন্ট খাত থেকে বন্দরের আয়ও তত বেড়েছে। অন্যদিকে বন্দরের সবচেয়ে বড় রাজস্ব উৎস কনটেইনার লোডিং-ডিসচার্জিং (জাহাজের ক্রেন ব্যবহার করে) কার্যক্রম। এ খাত থেকে প্রতি টিইইউতে গড়ে ৭১ দশমিক ৬৮ ডলার আয় হয়েছে, যা মোট রাজস্বের ৪৭ শতাংশ।

এছাড়া কিউজিসি (কুই গ্যান্ট্রি ক্রেন) চার্জ থেকে প্রতি টিইইউতে গড়ে ১৭ দশমিক ৯১ ডলার আয় হয়েছে, যা মোট রাজস্বের প্রায় ১২ শতাংশ। লিফট অন ও লিফট অফ কার্যক্রম থেকে প্রতি টিইইউতে গড়ে আয় হয়েছে ৯ দশমিক ৪৩ ডলার, যা মোট রাজস্বের ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্য আয়ের মধ্যে রয়েছে এক্সট্রা মুভমেন্ট, ওয়ার্ফ রেন্ট, হোস্টিং চার্জ, স্টাফিং-আনস্টাফিং প্রভৃতি।

উল্লেখ্য, এ বিশ্লেষণে শুধু অপারেটিং কার্যক্রম (কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং) থেকে অর্জিত রাজস্ব বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। নন-অপারেটিং খাতের আয় যেমন ব্যাংক সুদ (এফডিআর), জমি ও স্থাপনা ভাড়া কিংবা অন্যান্য বিনিয়োগজনিত আয় এতে অন্তর্ভুক্ত নেই। বন্দরের টার্মিনাল অপারেটররাও মূলত কনটেইনার বা কার্গো ওঠানো-নামানো এবং বন্দর ইয়ার্ডে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সংরক্ষণের বিপরীতে এ চার্জ আদায় করে।

চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক পর্ষদ সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম  বলেন, ‘স্টোর রেন্ট থেকে বেশি আয় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, এটি বন্দর ও সরবরাহ শৃঙ্খলের অদক্ষতার প্রতিফলন। এটাকে অপারেটিং আয়ে অন্তর্ভুক্ত করাটাও অযৌক্তিক। বন্দরের অভ্যন্তরে কেন ৩০-৪০ হাজার কনটেইনার দীর্ঘ সময় পড়ে থাকে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে কাস্টমস, আমদানিকারক, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের ভূমিকা ও দায় কতটুকু, সেটিও চিহ্নিত করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌স্বাভাবিক অবস্থায় কনটেইনার বন্দরে পৌঁছার তিনদিনের মধ্যেই খালাস হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে একটি কনটেইনার গড়ে এক সপ্তাহের বেশি সময় বন্দরে থাকে। এর পেছনে কাস্টমস প্রক্রিয়ার বিলম্ব যেমন রয়েছে, তেমনি কম খরচে সংরক্ষণের সুযোগ থাকায় কিছু আমদানিকারকও দ্রুত খালাসে আগ্রহী হন না। বর্তমানে জাহাজের জেটি পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। তাহলে প্রশ্ন হলো কেন কনটেইনার দীর্ঘ সময় ইয়ার্ডে পড়ে থাকে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ বিলম্বের কারণ সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব। কনটেইনারের অবস্থানকাল কমাতে পারলেই বন্দরের প্রকৃত সক্ষমতা বাড়বে।’

বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, জাহাজ থেকে কনটেইনার বন্দরে নামানোর পর পণ্য খালাস সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সময় বা ডুয়াল টাইম বন্দরের সক্ষমতা পরিমাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। নৌ-পরিবহনমন্ত্রীকে দেয়া বন্দর কর্মকর্তাদের একটি প্রেজেন্টেশনে জানানো হয়, চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিটি কনটেইনারের গড় অবস্থানকাল বর্তমানে সাড়ে নয় দিন। প্রেজেন্টেশনে উল্লেখ করা হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স পর্যন্তই এ সময়ের বড় অংশ ব্যয় হয়। কনটেইনার খালাস প্রক্রিয়া দ্রুত করার লক্ষ্যে কাস্টমস প্রি-অ্যাসেসমেন্ট অর্থাৎ আমদানির আগে বা বিল অব এন্ট্রি দাখিলের আগেই সম্ভাব্য শুল্ক ও কর নির্ধারণের উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। একই সঙ্গে গ্রিন চ্যানেলের পরিসরও সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার প্রক্রিয়াগত বিলম্ব এবং আমদানিকারকদের একটি অংশের বন্দরের ভেতরে কনটেইনার রেখে সুবিধাজনক সময়ে খালাস করে নেয়ার প্রবণতাও ডুয়াল টাইম দীর্ঘ হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে বলে উল্লেখ করা হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স কার্যক্রম সম্পন্ন থাকলে চট্টগ্রাম বন্দর গড়ে মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে পণ্যবাহী কনটেইনার ডেলিভারির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সক্ষম।

চট্টগ্রাম বন্দরের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম গতিশীল রাখার স্বার্থে প্রতি মাসে কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কনটেইনার বন্দর থেকে বের করা গেলে ইয়ার্ডে জায়গা খালি থাকবে, ফলে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম আরো দ্রুত করা সম্ভব হবে। বিষয়টি সরাসরি বন্দরের সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। আমদানীকৃত পণ্য আমদানিকারকের হাতে পৌঁছা পর্যন্ত প্রক্রিয়ায় অনেক সংস্থার সম্পৃক্ততা রয়েছে। কনটেইনার দ্রুত ডেলিভারি নিশ্চিত করা গেলে বন্দরের অভ্যন্তরীণ জায়গা ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ে এবং সামগ্রিক কার্যক্রমে গতি আসে।’

BBS cable ad

আমদানী/রপ্তানী এর আরও খবর: