গাজীপুরে টিকাকেন্দ্রে উপচে পড়া ভীর, ছিলনা স্বাস্থ্যবিধি
ফয়সাল আহমেদ, (গাজীপুর সদর) :
গাজীপুরের শ্রীপুরের আবদারবাজার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টিকা দেয়ার কথা ছিল সকাল ৯টা হতে। সাধারণ লোকজন সঠিক সময়েই লাইনে দাঁড়িয়েছিল। তবে কেন্দ্রটি উদ্ভোধন করার কথা ছিল স্থানীয় সাংসদ ইকবাল হোসেন সবুজের। তিনি এলেন সকাল সাড়ে দশটায়। এরই মধ্যে তিনটি লাইনের আকার বড় হয়ে উঠে। পরে নির্ধারিত সময়ের দেড় ঘন্টা পর টিকা কেন্দ্র উদ্ভোধন হয়। টিকা দেয়ার খবরে এই কেন্দ্রে উপস্থিত হয় হাজারো মানুষ। তবে কেন্দ্রে নির্ধারিত ছিল ৬শত মানুষের মধ্যে টিকা প্রদান। দুপুর ১টায় শেষ হয়ে যায় টিকা। ফলে বেশীরভাগ মানুষই আশাহত হয়ে বাড়ী ফিরে যান। তবে যারা টিকা নিতে পেরেছেন তারা খুবই খুঁশি হয়েছেন। যদিও স্বাস্থ্য বিধির কোন বালাই ছিল না এই টিকা কেন্দ্র সহ কোন টিকা কেন্দ্রতেই।
সকাল ৯টায় লাইনে দাঁড়িছেন আবদার পশ্চিম পাড়ার বিধবা আমেনা খাতুন। তিনি বলেন, দেড় ঘন্টা অপেক্ষার পর টিকা দিতে পেরে খুবই ভালো লাগছে। গত কয়েকদিন ধরেই তার বাড়ীতে স্থানীয় ইউপি মেম্বার গিয়ে বলে এসেছিল এই টিকা দিলে নাকি করোনায় আর মারা যাব না। তাই টিকা দিতে এসেছি। তিনি তার দুই সন্তানকেও টিকা দিতে কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন।
আবদার এলাকার আফাজউদ্দিন ভেন্ডার বলেন, এখন বয়স হয়েছে। নানা ধরনের অসুখে ভর করেছে। করোনার কারনে ছেলে ঘর থেকে বের হতে দেয় না। টিকা দিলে অন্তত করোনার ভয়টা দূর হয়ে যাবে এ আশায় টিকা দিয়েছি। তবে স্বাস্থ্যবিধির কোন উদ্যোগ না থাকায় তিনি হতাশা ব্যক্ত করেন। তিনি আরো বলেন, যেভাবে আজ ঠেলাঠেলি করে টিকা দিতে হলো না জানি করোনা এই কেন্দ্র থেকে কতটা সংক্রমিত হয়।
নাসরিন আক্তার এসেছিলেন এই কেন্দ্রে টিকা দিতে দীর্ঘ দুই ঘন্টা অপেক্ষার পর টিকাদানকারী তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে তার দেড় বছরের শিশু রয়েছে। তবে তিনি কিভাবে টিকা পাবেন, কবে পাবেন এ বিষয়ে কোন নির্দেশনা না পাওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করে বাড়ী ফিরে যান।
সত্তোরোর্ধ নারী রাহিমা খাতুন এতো সহজে করোনার টিকা দিতে পারবেন তা ভেবেই পাচ্ছিলেন না। তিনি তার ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন। নিজ বাড়ীর পাশে এভাবে কোন খরচ ছাড়াই করোনার টিকা দিতে পেরে তিনি সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
আবদার উত্তর পাড়ার ছালেমা আক্তার বলেন,করোনাকে নিয়ে আমাদের মধ্যে কত ভয়। এই টিকাতে ভয় অনেকটা কেটে গিয়েছে। অন্তত মনের মধ্যে একটা সান্তনা তৈরী হয়েছে। যাক মহামারীতে অন্তত মরবো না।
টিকা দিতে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন আব্দুল আলী। তিনি বলেন, তিনি এসে লাইনের পেছনে পড়েছিলেন। পরে বলা হয় টিকা শেষ। তিনি কবে টিকা পাবেন এ বিষয়ে কেউ কোন জবাব দিল না। তার মতে আমাদের সবার বিষয়টা সরকারের ভাবনায় থাকতে হবে।
একই অবস্থা সোহেলী বেগমের। তিনি বলেন, এভাবে স্বাস্থবিধি উপেক্ষা করে লাইনে দাড়ালাম, টিকা শেষ হয়ে যাওয়ায় দিতে পারলাম না। কেউ পেল কেউ পেল না, এটা কর্তৃপক্ষের কেমন কাজ করলো। আমাদের কবে দিবে তাও বললো না।
এই কেন্দ্রের স্বাস্থ্য সহকারী রফিকুল ইসলাম ( টিকাদান কর্মী) বলেন, আমাদের কেন্দ্রে ৬’শত মানুষের টিকা এসেছে। যা আগে আসলে আগে পাবেন ভিক্তিতে দেয়া হয়েছে।অনেকেই নিজে নিবন্ধন করে এসেছেন । যারা নিবন্ধন ছাড়া এসেছেন তাদেরকে আমরা নিবন্ধন করে টিকা দিয়েছি। তার এই কেন্দ্রে ৩৪৮জন পুরুষ ও ২৫২জন নারী টিকা নিয়েছেন। টিকা দেয়ার পাশাপাশি তাদের প্রত্যেককেই টিকার কার্ড দেয়া হয়েছে। তার দাবী কেন্দ্রগুলোতে যদি সেচ্ছাসেবক রাখা হতো তাহলে অন্তত সাস্থ্য বিধি মানা যেত।
তেলিহাটি ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ড সদস্য তারেক হাসান বাচ্চু বলেন, তার এই ওয়ার্ডে সাড়ে ছয় হাজার ভোটার রয়েছেন। টিকার উপযুক্ত মানুষ রয়েছে পাঁচ হাজার। সরকারী ভাবে শুধু আজ ছয়শত মানুষের মধ্যে আজ টিকা দেয়া হলো। টিকার খবরে অনেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে কেন্দ্রে উপস্থিত হলেও কোটা শেষ হয়ে যাওয়ায় আর তারা দিতে পারেননি। অনেকেই আশাহত হয়ে ফিরে গেছেন। দ্রুত তাদের টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করার দাবী তার। অন্যথায় মানুষের মধ্যে ভূল ধারনা তৈরী হবে।
তিনি আরো বলেন, সরকারী সিদ্ধান্ত আসার পর থেকেই তিনি বাড়ী বাড়ী গিয়ে লোকজনদের টিকার কথা বলেছেন। তিনি নিজে নিবন্ধন করেছেন। প্রথম অবস্থায় অনেকেই রাজী না হলেও টিকা শুরুর পর অনেকেই কেন্দ্রে এসে উপস্থিত হয়েছেন। টিকা নিয়ে সবার মধ্যেই ব্যাপক আগ্রহ।
শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ প্রণয় ভূষন দাস বলেন, তার উপজেলায় ১১টি কেন্দ্রে ৬শত করে মোট ৬হাজার৬শত লোককে টিকা দেয়া হয়েছে। টিকার জন্য প্রতি ইউনিয়নে ১টি ওয়ার্ড বেছে নেয়া হয়েছিল। পর্যায়ক্রমে সব ওয়ার্ডেই টিকা দেয়া হবে।
গাজীপুরের সিভিল সার্জন খায়রুজ্জামান বলেন, গাজীপুরের পাঁচটি উপজেলায় ৪২টি কেন্দ্রের মাধ্যমে গণহারে টিকা উদ্ভোধনের প্রথম দিন ৩৩হাজার ৬শত জনকে টিকা দেয়া হয়েছে। এছাড়াও সিটিকর্পোরেশন এলাকার ৫৭টি ওয়ার্ডের ৫৭টি কেন্দ্রের মাধ্যমে ৩৪হাজার ৪শত জনকে টিকা দেয়া হয়েছে। এমন ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। তবে যেহেতু গণহারে টিকার কথা বলা হয়েছে, সেহেতু অনেকেই টিকা কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছেন। ইচ্ছে থাকা সত্বেও স্বাস্থ্যবিধি অনেকেই মানেননি। আমাদের কেন্দ্রগুলোতে নির্ধারিত টিকা শেষ হয়ে যাওয়ায় যারা টিকা দিতে পারেননি, তাদেরকে পরবর্তীতে টিকা দেয়া হবে।
গাজীপুর-৩ আসনের সাংসদ (শ্রীপুর-গাজীপুর সদর) মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন সবুজ বলেন, সরকারের জন্য এমনভাবে টিকা প্রদান একটি মাইল ফলক। সাধারণ মানুষ যাতে টিকা নিতে কেন্দ্রে আসে বিষয়টি তিনি নজরদারী করেছেন। তিনি গাজীপুর সদর উপজেলা ও শ্রীপুরের বিভিন্ন টিকা কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে টিকা দিতে পারা মানুষের চোখে মুখে হাসি দেখতে পেয়েছেন। তবে সবাইকে আশ্বস্ত করেছেন তার নির্বাচনী এলাকায় টিকাতে কেউ বাদ পড়বে না। একটু ধৈর্য ধরার আহবান তার।


