অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও জিডিপিতে প্রায় দ্বিগুণ প্রবৃদ্ধি
উচ্চ সুদের কারণে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি তলানিতে নেমেছে। নতুন বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। অর্থনীতির এমন মন্দাবস্থার মধ্যেও মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। গতকাল সংস্থাটির প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুসারে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সাড়ে ৪ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর আগের অর্থবছরের একই প্রান্তিকে ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। এক্ষেত্রে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপিতে প্রায় দ্বিগুণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
জিডিপির পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিনটি বৃহৎ খাত কৃষি, শিল্প ও সেবায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। কৃষি খাতে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৩০ শতাংশ হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ হার ছিল দশমিক ৬০ শতাংশ (ঋণাত্মক)। শিল্প খাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৯৭, এক বছর আগে যা ছিল ৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আর সেবা খাতে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এ হার ছিল ২ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রান্তিকভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, আলোচ্য অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ, দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৪ দশমিক ৪৪, তৃতীয় প্রান্তিকে ৫ দশমিক ৩৩ ও চতুর্থ প্রান্তিকে ২ দশমিক ৪৭ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকের তুলনায়ও চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রায় দ্বিগুণ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
বিবিএসের পরিসংখ্যানে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে উল্লেখযোগ্য হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দেখানো হলেও এ সময়ে দেশের বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি গত বছরের জুলাইয়ে ৬ দশমিক ৫২, আগস্টে ৬ দশমিক ৩৫ ও সেপ্টেম্বরে ৬ দশমিক ২৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ১০ দশমিক ১৩, ৯ দশমিক ৮৬ ও ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ।
বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি তলানিতে থাকা অবস্থায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির এ পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কী কারণে এ প্রবৃদ্ধি হয়েছে সে বিষয়ে বিবিএসের কাছ থেকে ব্যাখ্যা দাবি করেছেন অর্থনীতিবিদরা। এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক (আইএনএম) ড. মোস্তফা কে মুজেরী বণিক বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে, বিনিয়োগে ক্ষেত্রে খরা চলছে। এ অবস্থায় জিডিপিতে শিল্প উৎপাদনে প্রায় ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কীভাবে হয়েছে সেটি বোধগম্য নয়। কী কারণে এ প্রবৃদ্ধি হয়েছে সে বিষয়ে বিবিএসের পক্ষ থেকে বিষয়টি স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা দেয়া উচিত। তা না হলে এ পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হবে।’
বাংলাদেশের সরকারি পরিসংখ্যান দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ। জিডিপির তথ্যে নেই বাস্তব চিত্রের প্রতিফলন। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি সরকারের নানা পর্যায় থেকেও জিডিপির তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বলা হয়েছে, উন্নয়নের বয়ান তৈরির জন্য জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকার। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন নথিতে পাওয়া তথ্য এবং অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশের জিডিপির প্রকৃত আকার ৩০০-৩৫০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে। যদিও তা দেখানো হচ্ছে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অতিরঞ্জিত করে দেখাতে বিগত সরকার দেশের জিডিপি পরিসংখ্যানকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী সরকারও এসব পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। কিন্তু এ বিষয়ে কাজ না করে বরং আগের ধারায় জিডিপির আকার নির্ধারণ করা হচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।


