ব্যাংকিং সেবায় নতুন ফি চালু ও চার্জ বৃদ্ধির সুপারিশ এবিবির আপত্তি ব্যবসায়ীদের
দেশের ব্যাংকিং সেবার ওপর একগুচ্ছ নতুন ফি আরোপ এবং বিদ্যমান বিভিন্ন চার্জ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সুপারিশ করেছে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)।
সম্প্রতি সংগঠনটির চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেয়া হয়েছে। এতে ১৪টি খাতে নতুন করে চার্জ আরোপের পাশাপাশি বিদ্যমান বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবার চার্জও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ আমানতকারী, ব্যবসায়ী, আমদানি-রফতানিকারক এবং ঋণগ্রহীতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এবিবির প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই)।
এবিবি সুপারিশের মধ্যে রয়েছে মাসে তিনবারের বেশি কাউন্টার থেকে নগদ অর্থ উত্তোলনে ১০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত ফি; দীর্ঘদিন অচল থাকা ব্যাংক হিসাব পুনরায় সচল করতে ৫০০ টাকা ফি এবং ঋণ প্রক্রিয়াকরণ (লোন প্রসেসিং) ফি কয়েক গুণ বাড়ানো। অন্যদিকে ঋণপত্র (এলসি) খোলার আবেদন গ্রহণে ১০০ টাকা, বিদেশী ঋণপত্রের নথি প্রক্রিয়াকরণে সর্বোচ্চ ২০ ডলার এবং স্থানীয় ঋণপত্রে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা চার্জ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। নথি অনুমোদন বা সত্যায়নের জন্য সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা এবং সক্রিয় ঋণপত্র বাতিল করতে ৫০০ টাকা ফি নেয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো গ্রাহকের অনুকূলে ফাইল অনুমোদনের ক্ষেত্রে খরচ আদায়ের সুযোগও চাওয়া হয়েছে।
নতুন ফি চালুর পাশাপাশি বিদ্যমান বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবার চার্জও বাড়ানোর সুপারিশ করেছে এবিবি। প্রস্তাব অনুযায়ী, সঞ্চয়ী হিসাবে গড় স্থিতি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি-মুক্ত থাকার বর্তমান সীমা কমিয়ে ৫ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে। ৫-২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত গড় স্থিতির হিসাবে মাসে ১৫০ টাকা এবং ২৫ হাজার টাকার বেশি হলে ৩০০ টাকা হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ ফি নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
ঋণ খাতে ঋণ প্রক্রিয়াকরণ ফি বর্তমান সর্বোচ্চ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ শতাংশ এবং পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন ফি দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঋণ আগাম পরিশোধের চার্জও দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া এলসি সংশোধন ফি ৭৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, ব্যাংক গ্যারান্টি কমিশনের সর্বোচ্চ হার দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং ন্যূনতম কমিশন ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সলভেন্সি সার্টিফিকেট, চেক রিটার্ন, স্টপ পেমেন্ট ও পে-অর্ডার ইস্যু ফি বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যালান্স কনফারমেশন সার্টিফিকেটের জন্য নতুন করে ৩০০ টাকা ফি নির্ধারণেরও সুপারিশ করেছে এবিবি।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে, বর্তমানে উচ্চ সুদহার, জ্বালানি ব্যয়, আমদানি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির চাপে শিল্প ও ব্যবসা খাত এমনিতেই সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকিং সেবার খরচ বাড়ানো হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে পড়বে। তাদের মতে, ব্যাংকগুলোর আয় বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও সেই দায় গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেয়া সমাধান হতে পারে না, বরং খেলাপি ঋণ কমানো, পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সেবার দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া উচিত।
এবিবির প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে গতকাল একটি চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার। সংগঠনের সভাপতি মো. আমিরুল হক এতে চিঠির সুপারিশগুলো অনুমোদন না দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয়, উচ্চ সুদহার ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ীরা কঠিন সময় পার করছেন। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং সেবার ওপর নতুন ফি আরোপ এবং বিদ্যমান চার্জ বাড়ানো হলে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় আরো বেড়ে যাবে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর।
চেম্বারের মতে, ব্যাংকিং সেবা এখন ব্যবসা-বাণিজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এলসি খোলা, তহবিল স্থানান্তর, চেক নিষ্পত্তি, গ্যারান্টি, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে অতিরিক্ত চার্জ যুক্ত হলে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ—সব ধরনের উদ্যোক্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বিশেষ করে এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের ওপর এর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়বে।
চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়, সরকারের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ক্যাশলেস লেনদেন সম্প্রসারণের লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যাংক চার্জ একটি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। ব্যাংকিং সেবা ব্যয়বহুল হয়ে উঠলে অনেক গ্রাহক আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও অনুকূল হবে না।
চট্টগ্রাম চেম্বার বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ জানিয়েছে, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্পোদ্যোক্তা এবং ভোক্তা প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে সার্বিক প্রভাব মূল্যায়ন করতে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা বৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংগঠনটি।
এবিবির প্রস্তাব প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, ‘দেশের ব্যাংক খাত এ মুহূর্তে নানামুখী সংকটের মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় অতিরিক্ত ফি বা চার্জ আরোপ করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং সেবার প্রতি আস্থাহীনতা বেড়ে যেতে পারে। তাই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব দিক বিবেচনা করবে।’


