নারীর এগিয়ে চলায় পাশে ব্র্যাক ব্যাংক
ব্যাংকের সূচনালগ্ন থেকেই নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, উদ্যোক্তা স্বপ্নপূরণ এবং ক্যারিয়ার অগ্রগতিকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ
করে আসছে ব্র্যাক ব্যাংক। নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা, আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষেত্রে
অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তোলার নানা উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংকটি নারীদের
অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদার ও ভবিষ্যৎ লিডার হিসেবে এগিয়ে
যেতে সহায়তা করছে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে ব্র্যাক ব্যাংক সম্মান জানাচ্ছে সেই সব
নারীদের— যারা ব্যাংকের সঙ্গে আছেন, ব্যাংকে কাজ করছেন এবং ব্যাংকের মাধ্যমে
নিজেদের স্বপ্ন, সাহস ও সাফল্যের গল্প লিখে চলার মাধ্যমে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক পরিবেশ গড়ে তুলতে অবদান রাখছেন।
রিটেইল ব্যাংকিং ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি
নারীদের জন্য বিশেষায়িত ব্যাংকিং
প্ল্যাটফর্ম ‘তারা’র মাধ্যমে ব্র্যাক ব্যাংক
আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিংব্যবস্থায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে চলেছে। সঞ্চয়, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং দায়িত্বশীল ঋণসুবিধার
মাধ্যমে এই প্ল্যাটফর্ম নারীদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা
রাখছে।
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ‘তারা’
প্ল্যাটফর্মে গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজারের বেশি,
যা আগের বছরের তুলনায় ২২% বেশি। এসব
গ্রাহকের মোট অ্যাকাউন্ট সংখ্যা ৪ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি, যেখানে ডিপোজিটের পরিমাণ প্রায় ১২,৯৬৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এটি আগের বছরের তুলনায় ৩৮.৭% বেশি।
বর্তমানে ব্যাংকটির মোট রিটেইল ডিপোজিটের ৩১% নারী গ্রাহকদের। ২০২৫ সালে নারীদের রিটেইল লোনের পরিমাণ আগের
বছরের তুলনায় ৪০% বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৩৮৬
কোটি টাকায়। ২০ হাজারেরও বেশি
নারী এই ঋণসুবিধা পেয়েছেন। নারীদের জন্য ইস্যু করা ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা প্রায়
২৯,৫০০।
এছাড়াও
ব্র্যাক ব্যাংকের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘আস্থা’-তে
নিবন্ধিত নারী গ্রাহকের সংখ্যা এখন ২ লাখেরও বেশি। যেসব নারীদের আয়ের কাগজপত্র নেই, ব্যাংকটির হোমমেকার্স অ্যাকাউন্ট সুবিধার মাধ্যমে সেসব নারীরাও এখন
নিজ নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছেন। এই সুবিধাটি
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এক নতুন দ্বার খুলে দিয়েছে।
নারী উদ্যোক্তা ও এসএমই সাপোর্ট
‘তারা’ প্ল্যাটফর্ম ব্র্যাক ব্যাংকের
এসএমই উদ্যোগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন, ব্যবসা উন্নয়ন সহায়তা এবং মার্কেট অ্যাকসেসের
সুযোগ তৈরি করছে।
২০২৫ সালে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকটির
এসএমই ঋণ পোর্টফোলিও দাঁড়িয়েছে ২,৬০৮
কোটি টাকায়, যা বিগত বছরের
তুলনায় ২২%-এরও বেশি। একই সময়ে ডিপোজিট বেড়ে ২,৮৭৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা ৬৭% বেশি।
বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংক ১ লাখ ৩০
হাজারেরও বেশি নারী উদ্যোক্তাদের সেবা দিচ্ছে। দেশে যতগুলো বেসরকারি বাণিজ্যিক
ব্যাংক নারীদের এসএমই ঋণ দিচ্ছে, তাদের মধ্যে ব্র্যাক
ব্যাংক একাই দিচ্ছে ২৩%।
দেশব্যাপী নারী উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা
বাড়াতে ৬৪টি জেলায় শাখা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও কর্মশালার
আয়োজন করেছে ব্র্যাক ব্যাংক, যেখানে
প্রায় ১,৯০০ জন নারী উদ্যোক্তা
অংশগ্রহণ করেছেন। প্রশিক্ষণে নারীদের বিজনেস ডকুমেন্টেশন, ব্যাংকিং সেবা এবং বিজনেস
ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। এখানে অংশগ্রহণকারী প্রায় ২৫% নারী অর্থায়ন সুবিধা
গ্রহণ করেছেন এবং ৬০%-এরও বেশি নারী ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে আনুষ্ঠানিক আর্থিকব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছেন।
ব্যাংকটির ‘আমরাই তারা’ উদ্যোগের আওতায় নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম,
ময়মনসিংহ ও খাগড়াছড়িসহ ১০টি জেলায় ৩০০ জন নারী উদ্যোক্তাকে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ও
ডিজিটাল মার্কেটিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
এবং চট্টগ্রাম ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির সহযোগিতায় পরিচালিত ‘উদ্যোক্তা
১০১ অ্যাক্সেলারেটর প্রোগ্রাম’-এর আওতায়
২০২৫ সালে ২৬৩ জন নারী উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ সুবিধা পেয়েছেন।
নারী উদ্যোক্তাদের মার্কেট অ্যাকসেস
বাড়াতে ঢাকায় আয়োজিত ‘তারা উদ্যোক্তা মেলা ২০২৫’-এ ৮৫ জন নারী উদ্যোক্তার পণ্য প্রদর্শনী হয়েছে। এতে সরাসরি বিক্রি হয়েছে ১ কোটি ৪০ লাখ
টাকারও বেশি পণ্য এবং প্রি-অর্ডার এসেছে ২৬ লাখ টাকার। মেলায় কিউআর কোডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ১৬ লাখ
টাকারও বেশি।
এছাড়াও ‘উদ্যোগতারা
অ্যাক্সেলারেটর প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে
২৫০ জনেরও বেশি নারী উদ্যোক্তাকে ব্র্যান্ডিং, পণ্যের ফটোগ্রাফি, হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার এবং
অনলাইন মার্কেটিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্ব, ক্যারিয়ার
অগ্রগতি ও অন্তর্ভুক্তি
২০২৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংকের নন-সেলস
কর্মীদের মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ ২৫%-এ পৌঁছেছে।
সম্ভাবনাময় নারী কর্মীদের নেতৃত্বগুণ বৃদ্ধি করতে ব্যাংকটি
চালু করেছে ইলিয়া (ELEA- Enlightened Leaders Exemplify
Achievement) প্রোগ্রাম, যেখানে প্রথম ব্যাচে ২৪ জন নারী কর্মী অংশগ্রহণ করেছেন।
এছাড়াও ‘Women
Beyond Boundaries’ উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন খাতের সফল নারী নেতৃত্বদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার আয়োজন করা হয়, যা ব্যাংকটির নারী কর্মীদের নেতৃত্বগুণ
বিকাশে ভূমিকা রাখে।
মাতৃত্বকালীন ছুটির পর নারীদের পুনরায় কর্মস্থলে স্বাচ্ছন্দ্যে ফিরে আসতে সহায়তা দিতে ব্যাংকটি একটি
বিশেষ পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করেছে। এতে চিকিৎসা সহায়তা, নমনীয় কাজ ও কর্মঘণ্টা এবং কাউন্সেলিং সুবিধা রয়েছে।
নারী কর্মীদের পেশাগত উন্নয়নে ব্যাংকটি
৭৫% থেকে ১০০% পর্যন্ত খরচ বহন করে প্রফেশনাল
সার্টিফিকেশন পলিসিও চালু করেছে।
কর্মক্ষেত্রে সচেতন ও অবচেতন পক্ষপাত
দূর করতে ব্র্যাক ব্যাংক ‘Antibias@Workplace’ উদ্যোগ
চালু করেছে।
এছাড়াও নারীদের
কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে হেড অফিসের
বাইরে আরও কয়েকটি স্থানে ডে-কেয়ার সুবিধা চালু করেছে ব্যাংকটি।
ব্র্যাক ব্যাংকে Sexual
Harassment Elimination (SHE) Policy কার্যকর রয়েছে, যা কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখার মাধ্যমে নারীদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত কর্মক্ষেত্র
নিশ্চিত করে।
কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর)
২০২৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংক সিএসআর উদ্যোগের আওতায় আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের ৮০৭ জন
ছাত্রীকে ‘অপরাজেয় তারা’ শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়েছে।
ক্রীড়া ক্ষেত্রে নেওয়া উদ্যোগ ‘অপরাজেয় আলো’ নারী হকি টুর্নামেন্টে দেশের আটটি বিভাগের ৩৪২ জন সম্ভাবনাময় নারী খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করেছেন।
‘অপরাজেয় আমি’
উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী ৪৪ জন নারীকে সেলাই প্রশিক্ষণ, ৫৬ জন প্রতিবন্ধী নারীকে ডিজিটাল ও মার্কেটিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও
বিনামূল্যে চোখ পরীক্ষা, ছানি অপারেশন ও চশমা প্রদানের
মাধ্যমে ৪০ হাজারের বেশি নারীর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করেছে ব্র্যাক
ব্যাংক।
নারীর ক্ষমতায়ন, উন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের নানা উদ্যোগ সম্পর্কে ব্যাংকটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর
অ্যান্ড সিইও তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, “নারীরা যখন ব্যাংকিং সেবা, আর্থিক জ্ঞান এবং
উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ পান, তখন তার প্রভাব শুধু পরিবারেই
সীমাবদ্ধ থাকে না— এতে স্থানীয়, তথা জাতীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হয়। ‘তারা’ প্ল্যাটফর্ম, এসএমই ট্রেনিং, নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মসূচি এবং সিএসআর উদ্যোগের
মাধ্যমে ব্র্যাক ব্যাংক নারীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে যাচ্ছে, যাতে তাঁরা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে
পূর্ণাঙ্গভাবে অংশ নিতে পারেন।”


