শিরোনাম

South east bank ad

৩৯২ সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কেবল ১০৮টি

 প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ন   |   মন্ত্রনালয়

৩৯২ সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কেবল ১০৮টি

সরকারি মালিকানাধীন ৩৯২টি কোম্পানি, সংস্থা, করপোরেশন, কর্তৃপক্ষ ও প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে চিঠি দিয়েছিল অর্থ বিভাগের ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)।

এর মধ্যে ২৮৪টি প্রতিষ্ঠানই প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ২৭টি প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো চিঠি সংস্থাটির কাছে ফেরত এসেছে। কেবল ১০৮টি প্রতিষ্ঠান আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এফআরসির পক্ষ থেকে প্রথম দফায় গত বছরের নভেম্বরে ২৯২টি প্রতিষ্ঠানের কাছে আর্থিক প্রতিবেদন চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় দফায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে আরো ১০০টি প্রতিষ্ঠানকে এ-সংক্রান্ত চিঠি দেয়া হয়। প্রতিবারই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য তিন সপ্তাহের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল।

এফআরসির কর্মকর্তাদের ধারণা, আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি না করার কারণেই হয়তো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তা জমা দিতে পারেনি। যদিও প্রতি বছর এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে জনগণের করের অর্থ ব্যয় করছে সরকার। এ অবস্থায় করদাতাদের অর্থের ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরীক্ষা কার্যক্রম ও আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির বিষয়টি কঠোরভাবে পরিপালন প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের অধীন বিভিন্ন অডিট অধিদপ্তরের আওতাধীন ৩৯২ প্রতিষ্ঠানের কাছেই মূলত আর্থিক প্রতিবেদন চেয়েছিল এফআরসি। এর মধ্যে সিভিল অডিট অধিদপ্তরের তিনটি, প্রতিরক্ষা অডিট অধিদপ্তরের আট, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন অডিট অধিদপ্তরের ২৫, আইটি ও জনসেবা অডিট অধিদপ্তরের ১০, মিশন অডিট অধিদপ্তরের আট, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান অডিট অধিদপ্তরের এক, সামাজিক নিরাপত্তা অডিট অধিদপ্তরের ১৯, স্বাস্থ্য অডিট অধিদপ্তরের ১৭, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অডিট অধিদপ্তরের ৪০, পূর্ত অডিট অধিদপ্তরের ১১, পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের ১৩, বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের ১৫২, ডাক, টেলিযোগাযোগ, বিজ্ঞান, তথ্য ও প্রযুক্তি অডিট অধিদপ্তরের ৩০, কৃষি ও পরিবেশ অডিট অধিদপ্তরের ১৭, বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের এক এবং শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের অধীনে থাকা ১৩টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরকারের বিভিন্ন কাউন্সিল, সংস্থা, কোম্পানি, করপোরেশন, কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ, বোর্ড, ফেডারেশন, একাডেমি, ফাউন্ডেশন, কেন্দ্র ও ইনস্টিটিউট, কমিশন, ট্রাস্ট, তহবিল, জাদুঘর, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ধরনের সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এফআরসির কর্মকর্তারা বলছেন, আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, কর্তৃপক্ষ, রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশন ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতি বছর আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত এবং তা নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নিরীক্ষা করতে হবে। কারণ আর্থিক প্রতিবেদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়, সম্পদ, দায় ও আর্থিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র জানা সম্ভব নয়। তাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন থাকা প্রয়োজন। এটি শুধু আইনি বাধ্যবাধকতাই নয়, বরং সুশাসন ও কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থাপনারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এ বিষয়ে এফআরসির চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এসব প্রতিষ্ঠানে আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হলে নিয়মিতভাবে আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করা অপরিহার্য। যেহেতু এসব প্রতিষ্ঠান সরকারের অর্থে পরিচালিত হয়, তাই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তাদের আর্থিক প্রতিবেদন থাকা বাধ্যতামূলক। এ কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। যারা এখনো জমা দেয়নি, তারা হয়তো প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে পারেনি। আমরা তাদের আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য আবারো রিমাইন্ডার দেব। যদি তারা প্রতিবেদন প্রস্তুত করে না থাকে তাহলে দ্রুত প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে উৎসাহিত করা হবে।’

সরকারের এসব প্রতিষ্ঠানের বাজেট ও অর্থ প্রদানের বিষয়টি তদারক করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। বিভাগটির কর্মকর্তারা বলছেন, সব প্রতিষ্ঠান আদৌ আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করে কিনা এ মুহূর্তে তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। কারণ সব প্রতিষ্ঠান সরাসরি একইভাবে অর্থ বিভাগের মনিটরিংয়ের আওতায় পড়ে না। অনেক প্রতিষ্ঠানের তদারকির দায়িত্ব তাদের নিজ মন্ত্রণালয় ও সংস্থার ওপরও বর্তায়। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আলাদা আইন ও বিধান কার্যকর রয়েছে।

কর্মকর্তাদের মতে, অডিট অধিদপ্তর ও সিএজি কার্যালয়ের আওতায় বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেগুলোর প্রকৃতি ও কাঠামো এক নয়। এসব প্রতিষ্ঠানকে সাধারণভাবে কেন্দ্রীয় সরকার, স্থানীয় সরকার, পাবলিক করপোরেশন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা—এ ধরনের বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়। কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের আয় দিয়ে পরিচালিত হয়, কিছু প্রতিষ্ঠান সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান জনস্বার্থে বাজার স্থিতিশীল রাখা বা সেবা দেয়ার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। ফলে সবার অডিট ও আর্থিক রিপোর্টিং কাঠামোও এক রকম নয়। এক্ষেত্রে দুই ধরনের অডিট ব্যবস্থা রয়েছে—একটি সিএজি বা সরকারি নিরীক্ষা, অন্যটি স্বাধীন বা ইনডিপেনডেন্ট অডিট। কোম্পানি আইন অনুযায়ী অর্থবছর শেষ হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে অডিট সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।

অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, আর্থিক প্রতিবেদন সংগ্রহ ও মনিটরিং কার্যক্রম আরো জোরদার করতে তারা ‘এসএবিআরই প্লাস’ নামে একটি ডিজিটাল সিস্টেম চালু করেছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক রিপোর্টিং মান (আইএফআরএস) অনুসরণ করে তৈরি এ প্লাটফর্মে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অডিট রিপোর্ট ও আর্থিক তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে আরো বেশি প্রতিষ্ঠানকে এ সিস্টেমের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কর্মকর্তাদের দাবি, এর মাধ্যমে আর্থিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ আগের তুলনায় আরো কার্যকরভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

সাবেক অর্থ সচিব ও সিএজি মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশেষায়িত পাবলিক অথরিটি, রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশন ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় একটি অংশ বছরের পর বছর নিয়ম অনুযায়ী আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত ও নিরীক্ষা সম্পন্ন করছে না। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন ও বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ পরিচালনা করে। আইন অনুযায়ী কোথাও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের মাধ্যমে, আবার কোথাও অডিটর জেনারেলের মাধ্যমে আর্থিক বিবরণী অডিট হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রতিবেদন সরকার বা সংসদে জমা দেয়ার বিধানও আছে। কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘদিন ধরে এসব নিয়মকানুন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।’

সাবেক এ সিএজি আরো বলেন, ‘অর্থ বিভাগের মনিটরিং ব্যবস্থা মূলত বাজেট-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা, নিয়মিত ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট প্রস্তুত, অডিট সম্পন্ন এবং নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়ার বিষয়গুলো কার্যকরভাবে মনিটর করা হয়নি। ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রকৃত হিসাব, আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।’

প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পেছনে সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যানুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৩০টি স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানসহ মোট ২৭৯টি প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন ধরনের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় বাবদ ১ লাখ ৩ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের নেয়া ঋণের গ্যারান্টারও সরকার। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো কারণে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সেটি শেষ পর্যন্ত সরকারেরই দায়ে পরিণত হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে সুশাসন ও জবাবদিহির ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও বহুদিনের। লোকসানি ও ভর্তুকিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূতভাবে বোনাস প্রদানসহ বিভিন্ন অনিয়মের উদাহরণও পাওয়া যায়। এ অবস্থায় জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিয়মিত অডিট ও আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।

জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেখানে জনগণের অর্থের বিষয় জড়িত, সেখানে অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে তা নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলকভাবে আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত থাকা উচিত। সিএজির কার্যালয় থেকেও বিষয়টি কঠোরভাবে তদারক করা যেতে পারে। সরকারের অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং তা সঠিক খাতে যাচ্ছে কিনা—বিষয়টি সুশাসনের অপরিহার্য অংশ। করদাতাদের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং তার হিসাব সংরক্ষণ ও প্রকাশের মাধ্যমে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সরকারি সংস্থাগুলো যদি নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত ও যথাযথ নিরীক্ষা নিশ্চিত করে, তাহলে ব্যক্তি খাতেও একই ধরনের কমপ্লায়েন্স ও স্বচ্ছতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় একটি শক্তিশালী নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি হবে।’

BBS cable ad

মন্ত্রনালয় এর আরও খবর: