অনেক ছাড় দিয়েও খেলাপি ঋণ কমাতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নীতিছাড়ের কারণে কেবল ২০২৫ সালেই রেকর্ড ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে। ২০২৪ সালে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা।
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমাতে পুনঃতফসিলের সুযোগসহ নানামুখী নীতিসহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সুযোগ নিয়ে গত বছর রেকর্ড ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিলও হয়েছে। সে ধারা অব্যাহত রয়েছে চলতি বছরও। এর পরও খেলাপি ঋণ কমছে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, কেবল চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। আর বছরের প্রথম ছয় মাসের (জানুয়ারি-জুন) হিসাবে এ বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে। জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এ নিয়ে দেশে দ্বিতীয়বারের মতো খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল।
এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়ায়। সে সময় ব্যাংক খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮০ কোটি টাকা, যার ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ বা ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা খেলাপির খাতায় ওঠে। এরপর খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নানামুখী নীতিসহায়তার উদ্যোগ নেয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ করে হলেও এককালীন এক্সিট সুবিধা, বড় ঋণখেলাপিদের জন্য ১৫ বছর মেয়াদি ঋণ পুনর্গঠনের মতো নীতিসহায়তা। কিন্তু এসবের পরও খেলাপি ঋণ কমছে না।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ব্যাংকের টাকা ফেরত না দেয়া এখন অনেকটা সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এত নীতিছাড়ের পরও খেলাপিরা ব্যাংকের অর্থ পরিশোধে এগিয়ে আসছেন না। আর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সময়ে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে যেসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, তার বেশির ভাগের হদিসও মিলছে না। অস্তিত্বহীন কোম্পানির নামে বিতরণকৃত ঋণ খেলাপি হওয়ায় সেগুলো আদায়ের পথও নেই। এমন পরিস্থিতিতে নীতিছাড় নয়, বরং ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধানের কথা বলছেন তারা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদারতা খেলাপি ঋণের পরিস্থিতিকে এতটা খারাপ জায়গায় নিয়ে এসেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক এ প্রধান অর্থনীতিবিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঋণখেলাপিদের বিষয়ে বছরের পর বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক নমনীয়তা দেখিয়েছে। এক্ষেত্রে দেখানো উদারতা সংকটের সমাধান করেনি। বরং সংকটকে আরো ঘনীভূত করেছে। অপরাধ ও অপরাধীকে প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে। এ কারণে খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগগুলো কাজে আসছে না।’
ড. জাহিদ হোসেন আরো বলেন, ‘কেবল ইউক্রেন যুদ্ধের কথা বলে ২০২২ সাল থেকে আমরা অনেক নীতিছাড় দিয়েছি। সেগুলোর কোনো কার্যকর ফল মেলেনি। যুদ্ধের মধ্যেও সারা দুনিয়া এগিয়ে গেছে। কিন্তু আমরা ইউক্রেন কিংবা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মধ্যে আটকে আছি। ব্যাংকগুলোয় ডিস্ট্রেসড অ্যাসেটও (দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ) বেশি। খেলাপি ঋণ কমাতে হলে অবশ্যই কার্যকর করপোরেট ও রেগুলেটরি গভর্ন্যান্স দরকার।’


