এনবিআরের রাজস্ব আহরণে ঘাটতি ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আহরণে ঘাটতি ছিল ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা।
আর এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাস শেষে লক্ষ্য ও আহরণের এ ব্যবধানের মাত্রা আরো বেড়ে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এনবিআরের মাসভিত্তিক রাজস্ব আহরণের বিবরণী বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতি বছরই অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) রাজস্ব আহরণ হয় অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশি। এনবিআর কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, করদাতাদের বড় একটি অংশ এ সময় সারা বছরের বকেয়া কর-ভ্যাট পরিশোধ করেন। সে অনুযায়ী, শেষ প্রান্তিকের প্রতি মাসেই লক্ষ্যমাত্রা ও আহরণের ব্যবধান কমে আসার প্রত্যাশা থাকে। যদিও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল শেষে দেখা যাচ্ছে এ ব্যবধান আরো বেড়েছে। এ অবস্থায় চলতি অর্থবছরে সংস্থাটির রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রায় এনবিআরের মাধ্যমে মোট ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার। এর মধ্যে প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) আহরণের লক্ষ্য ধরা হয় ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি ২৭ লাখ টাকা। যদিও এ সময়ের মধ্যে সংস্থাটির মোট আহরণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি ১৬ লাখ টাকায়। সে অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সংস্থাটির রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যের তুলনায় ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি ১১ লাখ টাকায়।
জানতে চাইলে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, ‘প্রথমেই যেটি বুঝতে হবে এ বছরটি স্বাভাবিক কোনো বছর নয়; অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। সাধারণত এনবিআরের পক্ষ থেকে মার্চ-এপ্রিল-মে মাসের দিকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিষয়ে বেশ জোরদার প্রয়াস নেয়া হয়। এ কারণেই শেষ প্রান্তিকে রাজস্ব আহরণ বেড়ে যায়।’
এবার রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি না পাওয়ার কারণ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা চলছে। আমদানি নেই, রফতানি কমেছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও কমেছে। আমদানি শুল্ক, মূসক ও স্থানীয় পর্যায়ের সম্পূরক শুল্ক আহরণে এরই প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তার ওপর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে একটি ‘শক’ তৈরি হয়েছে। এ বছর শুধু এনবিআর নয়, সবার জন্যই বেশ কঠিন সময় চলছে। এনবিআর এ নিয়ে চেষ্টা করছে। শেষ প্রান্তিকে তা হয়তো আরো জোরদার হওয়ার সুযোগ ছিল। তবে তারা চেষ্টা করেছে এবং করছে।’
এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মূলত কাস্টমস খাতে আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট খাতে সম্পূরক শুল্ক বাবদ রাজস্ব আহরণ সংকুচিত হওয়ার কারণেই এপ্রিলে ঘাটতির পরিমাণ আরো বড় হয়েছে। এ সময় স্থানীয় পর্যায়ে মূসক বাবদ আহরণের ক্ষেত্রেও লক্ষ্যের তুলনায় পিছিয়ে ছিল সংস্থাটি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এপ্রিলে আমদানি শুল্ক বাবদ রাজস্ব আহরণ হয়েছিল ৩ হাজার ৪১১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের এপ্রিলে এর পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২৮৮ কোটি টাকায়। সে অনুযায়ী, গত অর্থবছরের তুলনায় এনবিআরের আমদানি শুল্ক বাবদ রাজস্ব আদায় কমেছে ৩ দশমিক ৬২ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এ খাত থেকে মোট রাজস্ব আহরণ হয়েছে ২৯ হাজার ৯৩ কোটি ২২ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩১ হাজার ৭২৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে আমদানি শুল্ক বাবদ রাজস্ব আহরণে সংকোচন হয়েছে ৮ দশমিক ৯২ শতাংশ।
অর্থনীতি পর্যবেক্ষকদের ভাষ্যমতে, মূল্যস্ফীতি ও ভোক্তা পর্যায়ে চাহিদা মন্দার প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। বেসরকারি খাতেও ঋণ ও পুঁজির সঞ্চালন এখন আগের চেয়ে কম। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার প্রভাবও পড়েছে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে। বিশেষত যেসব পণ্য আমদানিতে শুল্ক বাবদ রাজস্ব আহরণ হয় সবচেয়ে বেশি, সেগুলোর আমদানিও এখন কমতির দিকে।
স্থানীয় পর্যায়ে আরোপিত সম্পূরক শুল্ক বাবদ রাজস্ব আহরণেও বড় ধরনের সংকোচন দেখা গেছে এপ্রিলে। ওই মাসে স্থানীয় পর্যায়ের সম্পূরক শুল্ক থেকে ৭ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা আদায় করেছে এনবিআর। গত বছরের একই মাসে এর পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৯৭৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সে অনুযায়ী, এপ্রিলে এ খাতে সংকোচনের মাত্রা দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ১৮ শতাংশে। আবার গত মাসে স্থানীয় পর্যায়ের মূসক বাবদ ১০ হাজার ৪১৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা আহরণের লক্ষ্য থাকলেও আহরণ হয়েছে ৯ হাজার ২০৭ কোটি টাকা। আয়কর বাবদ ১৪ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা লক্ষ্যের বিপরীতে আহরণ হয়েছে ১০ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে শুধু এপ্রিলে মোট ৪৫ হাজার ৬০৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এনবিআরের রাজস্ব আহরণ দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ৬০ কোটি টাকায়।
লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে থাকলেও মাসভিত্তিক হিসাবে এপ্রিলে এনবিআরের রাজস্ব আহরণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। আর অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এর হার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৬ শতাংশে।


