মাধবপুরের গেরিলা যোদ্ধা মিয়াব আলীর যুদ্ধে যাবার গল্প
শেখ জাহান রনি, (হবিগঞ্জ):
১৯৭১ সালের দেশ স্বাধীন অংশগ্রহনকারী যুদ্ধাদের একজন মাধবপুরের মিয়াব আলী। স্বাধীনতার যুদ্ধ গেরিলা বাহিনীর সদস্য ছিলন তিনি। ২২ বছরের টগবগ যুবক অস্ত্র চালাতে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন ভারতের ক্যাম্পে। স্বাধীনতার ৫০ বছর মিয়াব আলীর জীবন থেকে পিতা আব্দুল মালেক, মাতা ছায়েরা খাতুন, জীবন সঙ্গীনি ও বড় ছেলেকে হারিয়েও সুখেই আছেন তিনি। এক আলাপ চারিতায় হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলা সুলতানপুর গ্রামের মিয়াব আলী যুদ্ধে যাবার গল্প বলেন, সেই ১৯৭১ সাল মাঠের জমিতে ধুম চলছে জলি ধান বাইন (বানা)। সকাল পেরিয়ে দুপুরের সময় হঠাৎ সুলতানপুর গ্রামের ফসলের মাঠে আর্টিলারি পড়ল। গ্রামবাসি সকলে দৌড়াদড়ি শুরু করল।
প্রাণ বাচাঁতে বাবা আবদুল মালেক, মা ছায়েরা খাতুন ও ৭ বছরের ছোট ভাই আবুল বাশারকে নিয়ে বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে পঞ্চবটি দিয়ে ভারত প্রবশ করি। বাবা মা ও ছোটভাই সহ সোনারাম শরনার্থী ক্যাম্পে যাত্রী যাপন করি। রাত পেরিয়ে সকাল হল পরিবারের সবাইকে শরনার্থী ক্যাম্পে রেখে আমি সোনারাম থেকে পঞ্চবটি হয়ে কাতলামারা এলাকা আসি। কাতলামারা বাজার এসে দেখা হয় যায় সুলতানপুর গ্রামের আব্দুল আওয়াল চৌধুরী ও আদিউড়া গ্রামের দুলাল চৌধুরীর সাথে। আব্দুল আওয়াল চৌধুরী আমাকে ২টি রুটি, সবজি ও চা খাওয়ায়। খেতে খেতে আমাকে প্রস্তাব দেয় আগরতলা গিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেবার। আমি লেখাপড়া না জানা মানুষ, কিভাবে আগরতলা যামু ? আব্দুল আওয়াল চৌধুরী নিজের পকেট থেকে ১০ টাকা দিয়ে আমাক দুলাল চৌধুরীর সাথে আগরতলা পাটিয়ে দেয়।
দীর্ঘ ভ্রমন শেষে বিকালে আমাকে আগরতলা কংগ্রস ভবন নিয়ে যায় দুলাল চৌধুরী। সারা দিন থাকার পর ইউথ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। এক এক আমরা ৪৫ জনের একটি দল ইউথ ক্যাম্প মিলিত হই। ২ দিনপর ময়মনসিংহের আরাও ২ জন যুক্ত হলে ইউথ ক্যাম্পে আমরা মোট ৪৭জন। ওখানে বাংলাদশ লিবারশন ফার্স (বিএলএফ) ছিলেন এসএম মুসলিম, এড. মাহাম্মদ আলী পাঠান, জারু মিয়াসহ বেশ কয়েকজন। ইউথ ক্যাম্প থেকে হাপানি এলাকায় গিয়ে তাবু নির্মান করি, সেখান থেকে উম্পিনগর রিক্রুট সেন্টারে গিয়ে ১৩ দিনের মত থাকি। উম্পিনগর থেকে গকুলনগর নিয়ে আমাদের মেডিক্যাল করানা হয়। ৪৭ জনের মধ্যে ২জন মেডিক্যাল আনফিট হলে পুনরায় ৪৫জনের দলটিকে বর্তমান নয়া দিল্লির পশ্চিমাংশে পালোটান ট্রেনিং সেন্টারে নিয়ে ১৫ দিন ট্রেনিং দেওয়া হয়। শিক সৈন্যরা আমাদেরকে ট্রেনিং শেষে যুদ্ধকালীন সময়ে হজোমারায় ৩নং সেক্টর আমাদের পাটিয় দেয়।
ওই সক্টরের সদর দপ্তর ছিল ত্রিপুরা রাজ্যের কলাগাছিয়ায়। হবিগঞ্জ, আখাউড়া ও ভৈরব এলাকা ছিল ৩ নং সেক্টরের আওতায়। ওই সক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর কেএম শফি উল্লাহ, ক্যাপ্টেন নাসিম, সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন কাজী কবির উদ্দিন ও হেলাল মুর্শেদ ছিলেন ওই সক্টরের দ্বায়িত্বে। ইংরজি মাসের নাম ভুলে গেলেও ২৬ তারিখ যুদ্ধ করার জন্য তার হাত তুলে দেওয়া হয়েছিল ১টি এসএলআর, ৪টি ম্যাগজিন, এক্সটাগুলি ও ফিতা। অস্ত্র নিয়ে সেখান থেকে রাতেই বিশালঘর এলাকায় গিয়ে ব্যাংকার খুড়ে পশ্চিম মুুখি হয়ে অস্ত্র তাক করে রাখি। ৩ দিন বিশালঘর থেকে আবার চলে আসতে হয়েছে ৩ নং সেক্টরের সাব সেক্টর সুদর টিলায়। সেখান ফ্রিডম ফাইটার (এফএফ) বানিয়ে গাইডার ছিলেন বাঘাসুরা গ্রামের ছোয়াব আলী। গাইডার ছোয়াব আলীর সঙ্গে উচাইল গ্রামে গিয়ে ফজলু মিয়ার বাড়ীতে অবস্থা করি।
সেখান থেকে নাসিরনগরের লক্ষীপুর, লাখাই, বুল্লা, বানেশ্বর গ্যারিলা যুদ্ধ করি। বুল্লা গ্রামের সত্তর মম্বারের বাড়ীতে এসে মিত্র বাহীনির দেখা পাই। সেসময় আমাদের গাইডার ছিল ছিদ্দিক মিয়া। বানেশ্বর গ্রামে এক রাজাকারকে মারতে গিয়ে ওই রাজাকারের মা আমাকে দা দিয়ে খুব মারল আমি অস্ত্র বোট দ্বারা আটকিয়ে প্রান রক্ষা পাই। সেখান থেকে লাখাই গ্রামের জিরুন্ডা যাবার পর বুধবার দেশ স্বাধীন হয়েছে খরব পেয়ে অস্ত্র জমা দেওয়ার জন্য হবিগঞ্জের পোদ্দার বাড়ীতে যাই। আমার অস্ত্রের দায়ের খুব দেখ জেনারল ওসমানী সাহেব অস্ত্র গ্রহন করে নি। অস্ত্র দিয়ে জীবন বাঁচানোর বিষয়টি বললে জেনারল সাহেব আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে আদর করেন এবং অস্ত্রটি জমা নিয়ে আমাক একটি কম্বল উপহার দেন।
দেশ স্বাধীনের পর ১৫ দিন ট্রেনিং দিয়ছি। দেশ স্বাধীন হওয়ার ২ বছর পর বিয়ে করে সংসার শুরু করি। রিক্সা চালিয়ে জীবন কাটিয়ছি। সংসার জীবন ৪ ছেলে ছিল, ১৮ বছর আগে প্রিয়তমা স্ত্রী মারা যায়, ১০/১২ বছর আগ মারা গেছে বড় ছেলেটাও। বিএনপি সরকারের আমল মুক্তিযাদ্ধ হিসেবে অবমূল্যায়ন ছিল। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে ৩শ টাকা সম্মানীভাতা চালু করেছিল। আজ আমি ২০ হাজার টাকা মাস পাইতাছি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শেখ হাসিনা সম্মান করে বিল্ডিং ঘর বানাইয়া দিছে। শেখ হাসিনা সরকার আমাদেরকে খুশি ও সুখে রেখেছে।


