শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক তারেক রহমানের
দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে। ছবি : কালের কণ্ঠ
দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গতকাল রবিবার রাতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে ব্যবসায়ীরা দেশে ব্যবসা চালাতে গিয়ে চাঁদাবাজি, ব্যাংকের উচ্চ সুদ, আমলাতান্ত্রিক হয়রানি, নিরাপত্তার অভাবসহ বিভিন্ন সংকটের কথা তুলে ধরেন। তারেক রহমানও তাঁদের কথা শুনে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ব্যবসা খাতের সব প্রতিবন্ধকতা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বৈঠকটি শুরু হয়েছিল সমবেদনা বিনিময়ের আনুষ্ঠানিকতায়।
তবে অল্প সময়েই তা রূপ নেয় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের সংকট, নীতিগত জটিলতা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে গভীর ও বাস্তবভিত্তিক আলোচনায়। বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী নেতারা জানান, রাজনৈতিক সৌজন্যের বাইরে গিয়ে তারেক রহমান সরাসরি শিল্প ও বাণিজ্যের প্রকৃত চিত্র জানতে আগ্রহ দেখান। তিনি দীর্ঘ সময় নিয়ে ব্যবসায়ী নেতাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন।
গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে তৈরি পোশাক, ব্যাংকিং, শিল্প, বাণিজ্য ও সেবা খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের বর্তমান ও সাবেক নেতারা অংশ নেন।
এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিটিএমএ, এমসিসিআই ও ডিসিসিআইয়ের প্রতিনিধিত্বশীল উপস্থিতি বৈঠককে উচ্চ পর্যায়ের অর্থনৈতিক সংলাপে পরিণত করে।
বৈঠকের পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছেন, দেশের ব্যবসায়ীরা বর্তমানে বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, যে কারণে দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না। কর্মসংস্থান কমে এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়ার গতি ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাংকিং, স্টক এক্সচেঞ্জ ও ক্যাপিটাল মার্কেট—সবখানেই গুরুতর সংকট রয়েছে।
এসব সমস্যা নিয়েই শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শুধু সমস্যাগুলোর সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেননি, বরং প্রতিটি সমস্যার কী ধরনের সমাধান হতে পারে, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের মতামত জানতে চেয়েছেন। পাশাপাশি তিনি নিজেও যেগুলোকে বাস্তবসম্মত ও প্রয়োজনীয় মনে করেছেন, সেগুলো তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, চাঁদাবাজি, উচ্চ ব্যাংক সুদ ও দুর্নীতির কারণে ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়গুলো তারেক রহমানের কাছে তুলে ধরেছেন। তাঁরা মনে করেন, এসব সমস্যার সমাধান না হলে দেশি বা বিদেশি কোনো বিনিয়োগই সম্ভব নয়।
এদিকে বৈঠকে অংশ নেওয়া তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, তারেক রহমান প্রায় ৩০ জন ব্যবসায়ীর কথা শোনেন। সোমবার প্রয়াত খালেদা জিয়ার স্মরণে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর আয়োজিত দোয়া মাহফিলে আমন্ত্রণ জানাতে গেলে তারেক রহমান ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা করেন। ওই সময় তিনি আশ্বাস দেন, বিএনপি সরকারে এলে জ্বালানি সংকটসহ ব্যবসা ও শিল্প খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, ‘আমরা আমাদের বিরাজমান সমস্যাগুলো জানিয়েছি। জ্বালানি, আইন-শৃঙ্খলা, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, অসুবিধার কথা বলেছি। গণমাধ্যমের ঝুঁকির কথাও বলেছি। ব্যবসার খরচ যাতে কমানো যায়, শেয়ারবাজার যাতে শক্তিশালী করা যায়, ব্যাংকের ওপর যাতে নির্ভরশীলতা কমে—এসব বিষয়ে কথা বলেছি। গত এক বছর দেখলাম দেশে অনেক বেশি নিরাপত্তাসংকট। আমরা বলেছি যে সামগ্রিকভাবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন করতে হবে। শিল্প-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জন্যও নিরাপত্তা দিতে হবে।’
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বৈঠকের বিষয়ে বলেন, ব্যবসায়ীরা মূলত সমবেদনা জানাতে গেলেও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান অবস্থা জানতে চান। ব্যবসায়ীরা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত কিভাবে শিল্প ও ব্যবসাকে সংকটে ফেলছে, এলডিসি থেকে উত্তরণ, সংশোধিত শ্রম আইন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হয়রানির বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। এসব বক্তব্য তারেক রহমান মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, সমস্যাগুলো তিনি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তুলে ধরবেন। একই সঙ্গে তিনি এলডিসি থেকে এখনই উত্তরণকে একটি ‘আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’ বলে মনে করেন, যা দেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের সম্মানটা অত্যন্ত জরুরি। সব সময় ঢালাওভাবে বলা হয় যে ব্যবসায়ীরা সব চোর-বাটপার। কিন্তু ইকোনমি যদি বড় করতে হয়, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করা উচিত। সেটাই আমরা তাঁকে বলেছি। আমরা চাই, যে সরকারই আসুক না কেন তারা যাতে দায়িত্ববোধ নিয়ে আসে। অর্থনীতি হলো দেশের উন্নয়নের মূলভিত্তি। ফলে অর্থনীতিকে দাঁড় করাতে হলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়েই সরকারকে একসঙ্গে কাজ করা উচিত। তারেক রহমানও বলেছেন, তিনিও মনে করেন, যদি তাঁরা ক্ষমতায় আসতে পারেন তাহলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়ে পলিসিগুলো যেখানে যেখানে যা দরকার তা করবেন।’
প্রায় আড়াই ঘণ্টার বৈঠকে এ ছাড়া অংশ নেন বিটিএমএর সাবেক সভাপতি মতিন চৌধুরী, এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান, বিএসএমএ সভাপতি মইনুল ইসলাম স্বপন, বিএবি সভাপতি আব্দুল হাই সরকার। বৈঠকে আরো অংশ নেন ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, উত্তরা মোটরসের চেয়ারম্যান মতিউর রহমান, সিকম গ্রুপের এমডি আমিরুল হক, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, বিসিআইয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রীতি চক্রবর্তী, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ, পারটেক্স স্টার গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজুল কায়সার টিটু, স্টিল মিল মালিক সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বিটিএমইএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ, বিজিএপিএমইএ সভাপতি মো. শাহরিয়ার, বিএপিআই সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির, স্কয়ার গ্রুপের এমডি তপন চৌধুরী, মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, প্রাণ গ্রুপের সিইও আহসান খান চৌধুরী, বিএসআরএমের চেয়ারম্যান আলী হুসাইন আকবর আলী, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি কুতুবউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, এমসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি নাহিদ কবির, ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি হোসেন খালেদ ও ইউসিবিএলের চেয়ারম্যান শরীফ জহির।


